Sunday, July 27, 2025

স্মৃতিচারণ - ১৫

 কি হল , কথা গুলো শুনবি তো 

যেটা বলছিলাম । আজ তোর সাথে কথা বলতে বলতে ছেলেবেলার অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। অনেক ছোটবেলার কথা , তখন আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়ি। আমাদের শহরের একটা পুরনো মিশনারী স্কুল, ওই স্কুলে আমি ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোর অবধি পড়েছি। যদিও সেটা ছিল বাংলা মিডিয়াম স্কুল, কিন্তু আমাদের বাধ্যাতামুলক ভাবে বাইবেল এর গল্প পড়তে হত। পাঠ্য বই এর নাম ছিল "রাখাল রাজা"। যদিও সেটা ধর্ম গ্রন্থ থেকে নেওয়া কাহিনীর সংকলন ছিল , আমার কিন্তু দারুণ লাগত সে গল্প গুলো পড়তে। কিন্তু কথাটা সেটা নয়। আজ সেই গল্প গুলোর মধ্যে একটা গস্পেল হঠাৎ করে মনে পড়ছিল। সেই গল্পটা , যে গল্পে যীশুখ্রিস্ট জল কে ওয়াইন এ বদলে দিয়েছিলেন। সব গল্প ছেড়ে এটাই কেন । অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে ফিরে সেই একই কথা। ফর্মাল অবসর গ্রহণের পড়েও এখনও এখানে কন্সালট্যান্সি করি। কাজের ধরন বদলে গেছে , তাই এই সব উল্টো পাল্টা ভাবনার আগমন হয়। ভাবনা চিন্তা মাথায় এলে টুক করে লিখে ফেলা আমার অনেক কালের অভ্যাস । এবারও তাই হল লিখতে শুরু করে দিলাম। না লিখলে মুক্তি কোথায় , এ এক অদ্ভুত জ্বালা ।  সে যাই হোক, যে কথা বলছিলাম । গল্পটা খানিকটা এই রকম ছিল যত দুর মনে পড়ছে (ভুল হলে মাপ করে দেবেন), যীশু তার মা এর সাথে কোন এক বিয়েবাড়ি এর ভোজ এ গেছেন। ওদিকে মহা বিপদ, কন্যা পক্ষ খুব মুস্কিলে পড়ে গেছে ।অতিথি সেবার আয়োজনে বিভ্রান্তি , ওয়াইন এর যা ব্যবস্থা করা ছিল , তা সব শেষ। কন্যা পক্ষের মাথায় বজ্রপাত , তারা অতিথি সেবা কি ভাবে সম্পন্ন করবেন । এই সময় যীশুর মা যীশুকে বললেন "বাছা দেখত কি কাণ্ড, কন্যা পক্ষ খুব বিপদে পড়েছে, একটু এনাদের সম্মান রক্ষা কর বাবা ।" যীশু ছিলেন পরম দয়ালু মানুষ , অন্য কারুর কষ্ট দেখতে বা সহ্য করতে পারতেন না । উনি কাজের লোকদের বললেন পাত্রে করে কুয়ো থেকে জল নিয়ে আসতে। তারা নিয়ে এলো বেশ কয়েকটা জল ভরা পাত্র । যীশু সেগুলো স্পর্শ করলেন , আর সমস্ত জল ওয়াইন হয়ে গেল।  এই রকমের নানা গল্প  , যীশু একদিন কোন এক গ্রামে গেছেন , সবাই ওনার সাথে একবার দেখা করতে চায়। কত মানুষের কত রকমের বিপদ, কত রকমের কষ্ট , একবার চোখের দেখা পেলে শান্তি । ওই গ্রামের একটি মেয়ের খুব অসুখ , তাকে আর হয়ত বাঁচানো যাবে না, তার বাবা আর প্রতিবেশীরা তাকে বিছানা সমেত দড়ি বেঁধে ছাদ দিয়ে ওনার সামনে নামিয়ে দিল । যীশু , পরম দয়াময় , স্নেহের সাথে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই মেয়েটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল। 

কিন্তু কেন আমি এইসব কথা লিখতে বসলাম , সেটা ভাবতে হবে । ডাফ স্কুলে পড়ার সময়টা খুব মজার স্মৃতি দিয়ে ভরা। আসলে একা হলেই ছোটবেলা বার বার করে ফিরে আসে আর বড্ড জ্বালাতন করে। ডাফ স্কুলের মর্নিং সেকশন এর দিদিমনিরা সবাই খুব ভালোবাসতেন। তাই বুড়ো বয়েসে এসে ওনাদের কথা মনে পড়লেই সাথে সাথে স্কুলের নানা রকমের কথাও মনে পড়ে ,, এই স্মৃতিচারণ ও তাই

Wednesday, July 23, 2025

কিছু মুখ - এবার পাহাড়ে

 পাহাড়ে গিয়ে পাহাড়ের ছবি, ফুল, ঝাউবন , কুয়াশা, বৃষ্টি ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর বক বক করে ফেলেছি। এমনকি খাবার দাবার নিয়েও বোর করতে সুযোগ ছাড়িনি। কিন্তু কৌশণী তে আমাদের সারথী একটা মন্দিরে নিয়েগিয়েছিল। পুজো ইত্যাদি আমার ঠিক আসে না, মন্দির যায় স্থাপত্য দেখতে। বৈজুনাথ মন্দির,পাশে একটা ব্যারেজ, ( না আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হলেও ব্যারাজ বলব না, চুঁচড়োর মানুষ যে), সে কারণেই একটা বিশাল জলাশয় , আর সেই জলাশয় এর ঘাটে দেখি অনেক মানুষ , আর খুব রঙ্গীন ব্যাপারটা। কোনো ধর্মীয় রিচুয়াল চলছে । সবাই খুব সুন্দর করে সেজেছে, বাচ্চাগুলো এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। বেশ একটা খুশি খুশি পরিবেশ, পুট পুট করে ছবি তুলে ফেললাম কটা। ওই হাসিমুখ মানুষগুলোর খুশি খুশি ভাব দেখলাম খুব সংক্রামক,,,






















































































Tuesday, July 22, 2025

অবাধ্য নাগচম্পা

বছর তিন আগের কথা। পৃথিবী কোভিড আতঙ্ক পেরিয়ে সবে একটু থিতু হয়েছে । একদিন সন্ধ্যার সময় দোকান করে বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম আমাদের ফ্লোর এর ময়লা ফেলার গর্তের পাশে কেউ একজন একটা গাছ ফেলে রেখে গেছে। নিপাট ভাল মানুষ টাইপ এর গাছ,  একটু লম্বা মাথার কাছে বেশ গোছা মত পাতা। গাছের তো মুখ চোখ হয়না , তবুও কেন যেন মনে হল গাছটা আমাদের বলছে ," প্লীজ আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে , আমি তো না খেতে পেয়ে মরে যাব,, " কি আর করা যাবে , আমাদের দয়ার শরীর। দুজনে মিলে বাড়িতে ঢোকালাম। সে স্থান পেল আমার বাগানের বাঁ দিকের অংশে , যেখানে সবুজ পাতার গাছের থেকে ফুল ফোটা গাছের সংখ্যা বেশী। দিব্যি ছিল , আমরা রোজ ভাবি এবার গাছের মাথায় ফুল আসবে। কিন্তু সে তো হবার না, শুধু তর তর করে লম্বা হয়ে চলেছে। এভাবে দু বছর কেটে গেল ,, তার কোন উন্নতি নেই , সেই গাছের ভাব একই রকম, ফুল ফোটার নামই নিচ্ছে না। যে বাগানে কাজ করে এই আমাদের জ্ঞান দিল , বলল "গাছ টা একটু ছেঁটে দিন " । তাই করা হলো , সেই টুকরো গুলো না ফেলে দিয়ে অন্য একটা টব এ পুঁতে দেওয়া হলো। ও বাবা , সেই ডাল এক বরষায় লম্বা একটা গাছ হয়ে উঠলো। এখন আর একজন নয়। ওদের দুজন কে নিয়ে চিন্তা শুরু হল। কারুর ই মাথায় ফুল ফোটে না । খুব রাগ হল কদিন আগে গাছটার সামনে গিয়ে তুমুল রাগ দেখলাম , আর গালাগাল করে বললাম " কাজ নেই কম্ম নেই , খেয়ে দেয়ে শুধু ঢঙ করে লম্বা হয়ে চলেছে , ফুল দেবার কোন চেষ্টাই নেই ,,"  বকুনি দিয়ে আমার নিজেরও মেজাজ একটু খারাপ। তারপর দু তিন দিনখুব বৃষ্টি হল। কদিন আগে ব্রেকফাস্ট করতে বসে দেখি লম্বু মুচকি মুচকি হাসছে , গাছের মাথায় সাদা সাদা বেশ কয়েকটা ফুল। এই প্রথম দেখলাম গাছ ও বকুনি ভালবাসা বোঝে ,,কে জানে !!!

(পরে খোজ করে দেখলাম ইনি লাতিন আমেরিকার অধিবাসী নাম , প্লামেরিয়া পুদিকা। কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা এইসব দেশের ফুল, তাই তো ভালো প্রবাসে তার এত কেন দুশ্চিন্তা,, )

সন্ধ্যা নামার আগে

সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলো তৃতীয় দিনের শেষে। সামনে উপত্যকায় আস্তে আস্তে দিনের আলো কমে আঁধার নেমে এল, কালো হয়ে মিশে গেল ওই দূরের ঢালু পাইন বনের সাথে। টুপ টুপ করে আলো গুলো জ্বলে উঠেছে নিচে , দূরে বাড়ি গুলোর গায়ে গায়ে। এই ব্যাপার টা পুরোটাই কৌশনীর , নেচারস ভ্যালি রিসোর্ট এর ঘরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছিলাম। এটা তো গেল দিন শেষ এর উল্লাস করার মত গল্প। 

বাকিটা দিন কেমন গেল একটু বলি, সেটাও তো কম কিছু না , দারুন অভিজ্ঞতা হয়েছে আজ। সকালে নৈনিতাল থেকে বেরিয়ে গাড়ি চেপে রওনা দিলাম কৌশনির দিকে। দুটো তিনটে পাহাড় ডিঙিয়ে , আলমোড়া হয়ে কৌশানীর কাছাকাছি এসে আমাদের সারথী বলল সে আমাদের একটা জলপ্রপাত দেখাবে। আমি তো বেজায় খুশি। স্পটে পৌঁছে জানতে পারলাম জলপ্রপাত দেখতে গেলে দু কিমি হেঁটে যেতে হবে। রোজ দশ কিমি সাইকেল চালাই, দু কিলোমিটার তো নস্যি। সরু একটা পাহাড়ি রাস্তা , না রাস্তা না , কোনমতে যাবার মত একটা হাঁটা পথ। কিন্তু একটু এগোতেই দেখলাম প্রায় তিনতলা মত নিচে নামতে হবে, কয়েকটা পাথরের উপর পা দিয়ে, সে না হয় নামলাম , তারপর শুরু হলো চড়াই। ঘন জঙ্গল , মনে হচ্ছিল এই বুঝি একটা ভালুক এসে হ্যালো বলে হ্যান্ডশেক করবে , নাহলে একটা মিষ্টি চিতাবাঘ এসে বলবে একটা সেল্ফি তুললে কেমন হয়। এই সব ভাবতে ভাবতে ,দেড়ঘণ্টা অসম্ভব পরিশ্রম করে পৌঁছলাম সেখানে । দুজনে ঘামে ভিজে চুপুরী। মাথা থেকে টপ টপ করে ঘাম পড়ছে মাটিতে। কিন্তু ওখানে পৌঁছে অদ্ভুত একটা satisfaction হল। প্রায় ৩০ মিনিট ওখানে বসে ব্যাপারটা আত্মস্থ করলাম । নিচে নামার সময় অতটা চাপ হলো না।  দুজনে মিলে অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছি। তবে ৬২ বছর বয়েসে এই চাপ টা নেওয়া উচিত হয়নি মনে হয় , কিন্তু যে ভাললাগাটা আমার অ্যাকাউন্ট এ ক্রেডিট হল , সেটা কম কি।

নিচে নেমে একটা দোকানে ম্যাগী খেলাম, পুরো অমৃত সমান সঞ্জীবনী। আমাদের সাথে রাহুল ছিল  ( লোকাল গাইড , না না রাজু না , রাহুল)। ওর বন্ধুর দোকান , সেখানেই খুব যত্ন করে আপ্যায়ন করল। 
তারপর গাড়ি চেপে চলে এলাম আমাদের আগামী দুদিনের ঠিকানায়।

কুমায়নী খাবার

এবারের মত পাহাড়, লেক, কুয়াশা, মেঘ নেমে আসা, বন জঙ্গল ইত্যাদি শেষ হল। দুদিন আগেই পাহাড় থেকে নেমে এসে জঙ্গলের ধারে ঘাপটি মেরে বসেছিলাম। গতকাল জঙ্গলের মধ্যে খানিক এদিক ওদিক করলাম যদি বাবাঘমামাঘমামা , মামী বা ভাগ্না, ভাগ্নির সাথে দেখা হয় । কিন্তু সে গুড়ে বালি। জ্যাম এর ভয়ে করবেট থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে ৪ ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেছি। অগত্যা মধুসূদন , লাউঞ্জ বসে ঝিমোনো ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু কতক্ষন আর এ ভাবে বসা যায়। তাই ভাবলাম ঘোরাঘুরি পর্বের ম্যান্ডেটরি ব্লগ টা লিখেই ফেলি।

পাহাড়ের ছবি, ল্যাদের গল্প সব তো বললাম , কিন্তু কুমায়ানী খাওয়া নিয়ে কিছু বলা হয় নি। কৌশাণী তে সাহস করে একদিন লোকাল পাহাড়ি খাবার খেলাম। খাবার এর নাম শুনে খুব চাপ হয়ে গিয়েছিল , আলু কে গুটকে, ভাত কে ডুবকে, ভাত কি চূড়কানি , ভাঙ এর চাটনি, পাহাড়ী রায়তা, মাদুয়া রোটি, চাউল, বাল মিঠাই। কিন্তু খাবার গুলো খেয়ে অবাক হয়ে গেলাম । কি অপূর্ব স্বাদ, আর সব লোকাল সবজি দিয়ে বানানো। লোভ দেখানোর জন্য ছবিও দিলাম। উত্তরাখণ্ড এর এই দিকে এলে অবশ্যই খাবার গুলো একবার চেখে দেখা উচিত।

Saturday, June 21, 2025

কৌশানী এর কথা


পাহাড়, ঝাউবন , দেওদার আর তার সাথে মেঘের  আনাগোনা। মাঝে মধ্যে দু একপশলা হালকা বৃষ্টি। ভাগ্যিস কবিতা লিখতে পারি না , নাহলে কি কান্ড যে হত, এমন পরিবেশে কাব্যের  বন্যা বয়ে যেত। সে যাই হোক বিকালের দিকে চা খেতে বসে দেখলাম দূরে পাহাড়ের গায়ে একটা রামধনু তৈরি হতে শুরু করল, কিন্তু খানিক বাদে কি মনে হল তার কে জানে, আস্তে আস্তে হালকা মত হয়ে মিলিয়ে গেল। বিকাল বেলা, পাখিদের বাড়ি ফেরার সময়। দুটো ছোট্ট ছোট্ট পাখি সামনের আকাশে অনেকক্ষন ধরে খেলে টেলে বাড়ি চলে গেল। রিসর্ট এর ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিটা খুব লোভনীয়। দুপুর বেলা লাঞ্চ এর পর একটু বিছানায় ওলটপালট করে , এখানেই বসে আছি। কৌশানি জায়গাটা বেশ পছন্দ হয়েছে। একদম শোরগোল নেই। তাই পা ছড়িয়ে পাহাড় এর সাথে মেঘের রেষারেষি বেশ লাগছিল। বৃষ্টি এলো , দূরে উপত্যকায় কিন্তু রোদ্দুর। এই রকম শান্ত জায়গায় এক চুপ করে বসে নানা রকমের ভাবনা ভাবা যায়, যা আমাদের শহুরে জীবনে খুবই দুষ্প্রাপ্য ব্যাপার একটা। কৌশানীতে এবারের মত আজ শেষ সন্ধ্যা। কাল নেমে যাব জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কে। তাই মনটা একটু কেমন, ভারী বা উদাস না, আরো একটা দিন থাকলে তৃপ্তিটা একটু বেশী হত। আমাকে সাধারণত সমুদ্র বেশি টানে। কিন্তু এবার কৌশনীতে এসে একটা অন্য ভালো লাগা পেলাম। বয়স হচ্ছে, মন হয়ত শান্ত পরিবেশ পছন্দ করতে শুরু করেছে,, এটা কি হিসাব মেলানোর সময় এর ইঙ্গিত।
পুনশ্চ: আমার পদযুগল মোটেই দেখার মত কোন বস্তু না , শুধুমাত্র ফটোগ্রাফির ভাষায় "depth of field" ব্যাপারটা ,, ওই আরকি ফোরগ্রাউন্ড অবজেক্ট,,,😃😃

Sunday, June 1, 2025

স্মৃতিচারণ -১৮ - টেপ রেকর্ডার

গতকাল হঠাৎ করে ইচ্ছা হলো একটু অকারণ browse করি। অনর্থক খোঁজা খুঁজি, মাঝে মাঝে করি, এরকম করতে করতে অনেক সময় নতুন কিছু খুঁজে পাই, পড়ে ফেলি, কিছু না কিছু নতুন জ্ঞান তো লাভ হয় । এই নতুন কিছু খুঁজে বেড়ানোর নেশাটা দাদাভাই এর কাছ থেকে পাওয়া। ছোটবেলায় নানারকমের বই নিয়ে এসে আমাদের দিতো , তখন স্ট্যান্ডার্ড লিটারেচার বলে একটা বই এর প্রতিষ্ঠান ছিল , তার দেশ বিদেশের অনেক অনেক বই এর সম্ভার বাড়িতে পৌঁছে দিত। সেই বই গুলোর মধ্যে আমার খুব প্রিয় ছিল "Popular Science " , দশ ভলিউম এর মোটা মোটা বই। বিজ্ঞান এর নানা তথ্য  ঠাসা সেই বই গুলো ছিল আমার মনের দৌড়ে বেড়ানোর তেপান্তরের মাঠ। আর তার সাথে ছিল নানা রকমের এক্সপেরিমেন্ট করার উৎসাহ, সেটা অবশ্যই দাদাভাই জোটাত। তার ফলে অনেক কম বয়েসেই নানা রকমের ব্যাপার স্যাপার শিখে ফেলেছিলাম। এই সব এর সাথে সাথে দাদদভাই এর গান বাজনার চর্চা ছিল। রবীন্দ্র চর্চা আমাদের দিন যাপন এর একটা বিশেষ অঙ্গ ছিলো। যেহেতু গান বাজনা এর চর্চা ছিলো তাই বাড়িতে বেশ কিছু যন্ত্র পাতি ও ছিল। তার মধ্যে আমার স্পুল টেপরেকর্ডার ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যজনক লাগত। একটা চাকা থেকে আর একটা চাকায় খয়েরি রঙের ফিতে গুটিয়ে নেয় , তাতে গান রেকর্ড হয়ে যায়, সেটা আবার পরে চালিয়ে শোনা যায়। কিন্তু কেন এই সবি গাল গল্প করছি, এর সাথে ইন্টারনেট ব্রাউজ করার ই বা কি সম্পর্ক ?? বলছি সেই কথা । গতকাল ব্রাউজ করতে করতে হঠাৎ মনে হলো স্পুল টেপরেকর্ডার সার্চ করি ,, অনেক মডেল এর টেপরেকর্ডার এর হদিস পেলাম। একটু একটু জিয়া নস্টাল যে হচ্ছিল না তা নয়। হঠাৎ করে দুটো মডেল এর ছবি পেলাম , যে দুটো আমি ছোটবেলায় অনেক নাড়াচাড়া করেছি। এই প্রসঙ্গে দুটো স্মৃতি মনে এলো। সেগুলোর কথা বলি একটু 

প্রথম গল্পঃ 

আমাদের পাড়ায় একটা মাঠ ছিল , সেই মাঠে একটা তালগাছ ছিল। তাই মাঠের নাম ছিল তালতলা। আমাদের বড় বাড়ির লাগোয়া ছোট্ট মাঠ। সকালে আমরা সেখানে ক্রিকেট , ডাংগুলি খেলতাম , আর শীতকালে সন্ধ্যাবেলা মেজদা আর বন্ধুরা মিলে বড় বড় আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলত। আর মাঝে মাঝে স্টেজ বেঁধে নাটক বা গানের অনুষ্ঠান হত। আর আমার দাদাভাই এর কালচারাল ক্লাব ছিল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশান, এখানে গান নাটক আবৃত্তি এই সব নিয়ে চর্চা হত। সেবার তালতলায় নাটক হবে , তখন আমি বোধহয় ৫ কি ৬। আমার ডাক পড়ল, কোন এক ছোট ছেলের চরিত্রে অভিনয় করতে হবে । ওই আর কি , স্টেজে দাঁড়ানর রোল । তাও উৎসাহের অভাব নেই , রীতিমত রিহার্সাল দেওয়া চলল। কিন্তু ভাগ্য খারাপ , অনুষ্ঠানের দু দিন আগে জ্বর আসল আমার, ধুম জ্বর। আমাদের ফ্যামিলি ফিসিসিয়ান ডাঃ ক্যাপ্টেন দাস এর কড়া নির্দেশ, বাড়ি থেকে বাইরে  যাওয়া তো  ডুরের কথা , বিছানা থেকে নামা নিষিদ্ধ হয়ে গেল। খুব মনখারাপ , কত আর বই পড়া । আমার মন মেজাজ থিক করতে দাদাভাই একটা ছোট্ট তিন ইঞ্চি স্পুলের টেপ রেকর্ডার আমাকে দিয়ে গেল। ব্যাস সব মন খারাপ একদম জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে লেগে পড়লাম ওই অবাক করা যন্ত্র নিয়ে। জ্বরের কষ্ট, নাটক না যেতে পারা , সব দুঃখ এক নিমেষে উধাও। সেটা ছিল ফিলিপ্স এর তৈরি একটা পোর্টেবল স্পুল টেপ রেকর্ডার । নিচের ছবিটার মত ছিল সেটা । এখন ভাবতে বেশ অবাক লাগে, ব্যাট বল , ক্যাপ ফাটানো বন্দুক ইত্যাদির থেকে এই সব নিয়ে খেলতে বেশি ভাল লাগত।




দ্বিতীয় গল্পঃ 

এই গল্পটাও টেপ রেকর্ডার নিয়ে , তবে একটু বড়বেলার , ক্লাস টেন বা ইলেভেন। স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন একটা নাটক এর প্রস্তুতি চলছে , নাটক এর নাম জিওর্দানো ব্রুনো। তার আবহ সঙ্গীত করেছিল দাদাভাই আর মূল চরিত্রে ছিল দুলু দা। নাটকের আবহ সঙ্গীত পরবর্তী কালে অনেক করেছি, ওই সময় শেখা খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো অনেক কাজে লেগেছে। যে কথা বলছিলাম , এই নাটক এর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সবটাই রেকর্ড করা হয়েছিল Stellaphone এর টেপ রেকর্ডারে। বড় বড় ৮ ইঞ্চি স্পুল, ফোর ট্র্যাক। সত্তর এর দশকের শেষদিকে বাড়িতে এই রকম একটা যন্ত্র নিয়ে কাজ করা আমার কাছে একটা বিরাট পাওয়া। ওই নাটক এর জন্য গীর্জা এর ঘণ্টার আওয়াজ দরকার ছিল। তখন তো ইন্টারনেট ছিল না , তাই লাইভ রেকর্ড করা ছাড়া উপায় নেই , বাড়ির কাছে ব্যান্ডেল চার্চ , সেখানে ঘণ্টা ছিল সেটা বাজত, কিন্তু সেখানে রেকর্ড করতে গেলে অনেক বাড়তি অপ্রয়োজনীয় আওয়াজ চলে আসবে । কিন্তু চার্চ এর ঘণ্টার আওয়াজ তো চাই , নাহলে ইউরোপীয় পরিবেশ কি করে মঞ্চে তৈরী হবে। রূপালী সিনেমা হলে তখন বিধাতা বা দেবতা বলে হিন্দী ছবি চলছে। জানা গেল কোন এক দৃশ্যে গীর্জার ঘণ্টা বাজছে, এমন কিছু আছে। ব্যাস দাদাভাই আর আমি সেই stellaphone টেপ রেকর্ডার আর একটা মাইক্রোফোন নিয়ে পৌঁছে গেলাম রূপালী সিনেমা হলে। সিনেমা হলের ম্যানেজার এর সাথে কথা হল , আমরা পর্দার পেছনে যেখানে বিশাল সাউন্ড হর্ন থাকে সেখানে বসে পড়লাম যন্ত্রপাতি নিয়ে। গীর্জার ঘণ্টা রেকর্ড করা হল। কিন্তু সিনেমার রূপালী পর্দার পিছনে যে ওই রকম ধুলো আর ঝুল জমা হয়ে থাকতে পারে আমার জানা ছিল না। দুজনে ধুলো মেখে ভূত হয়ে বেরোলাম। তারপর ঐ নাটকটা অনেক জায়গায় মঞ্চস্থ হয়েছে । খুব মনে পড়ছে দাদাভাই দল নিয়ে এলাহাবাদ গিয়েছিল এই নাটক মঞ্চস্থ করতে, নাটক এর কোন কম্পিটিশন বা ফেস্টিভ্যাল ছিল । টেপ রেকর্ডারের ছবি গুলো দেখে হুড়মুড় করে কত কি মনে পড়ে গেল। Stellaphone টেপরেকর্ডার এর একটা ছবিও দিলাম । 

মাঝে মাঝে স্মৃতির পাতা ওল্টাতে বেশ লাগে, তাই না।