প্রথম গল্পঃ
আমাদের পাড়ায় একটা মাঠ ছিল , সেই মাঠে একটা তালগাছ ছিল। তাই মাঠের নাম ছিল তালতলা। আমাদের বড় বাড়ির লাগোয়া ছোট্ট মাঠ। সকালে আমরা সেখানে ক্রিকেট , ডাংগুলি খেলতাম , আর শীতকালে সন্ধ্যাবেলা মেজদা আর বন্ধুরা মিলে বড় বড় আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলত। আর মাঝে মাঝে স্টেজ বেঁধে নাটক বা গানের অনুষ্ঠান হত। আর আমার দাদাভাই এর কালচারাল ক্লাব ছিল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশান, এখানে গান নাটক আবৃত্তি এই সব নিয়ে চর্চা হত। সেবার তালতলায় নাটক হবে , তখন আমি বোধহয় ৫ কি ৬। আমার ডাক পড়ল, কোন এক ছোট ছেলের চরিত্রে অভিনয় করতে হবে । ওই আর কি , স্টেজে দাঁড়ানর রোল । তাও উৎসাহের অভাব নেই , রীতিমত রিহার্সাল দেওয়া চলল। কিন্তু ভাগ্য খারাপ , অনুষ্ঠানের দু দিন আগে জ্বর আসল আমার, ধুম জ্বর। আমাদের ফ্যামিলি ফিসিসিয়ান ডাঃ ক্যাপ্টেন দাস এর কড়া নির্দেশ, বাড়ি থেকে বাইরে যাওয়া তো ডুরের কথা , বিছানা থেকে নামা নিষিদ্ধ হয়ে গেল। খুব মনখারাপ , কত আর বই পড়া । আমার মন মেজাজ থিক করতে দাদাভাই একটা ছোট্ট তিন ইঞ্চি স্পুলের টেপ রেকর্ডার আমাকে দিয়ে গেল। ব্যাস সব মন খারাপ একদম জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে লেগে পড়লাম ওই অবাক করা যন্ত্র নিয়ে। জ্বরের কষ্ট, নাটক না যেতে পারা , সব দুঃখ এক নিমেষে উধাও। সেটা ছিল ফিলিপ্স এর তৈরি একটা পোর্টেবল স্পুল টেপ রেকর্ডার । নিচের ছবিটার মত ছিল সেটা । এখন ভাবতে বেশ অবাক লাগে, ব্যাট বল , ক্যাপ ফাটানো বন্দুক ইত্যাদির থেকে এই সব নিয়ে খেলতে বেশি ভাল লাগত।
এই গল্পটাও টেপ রেকর্ডার নিয়ে , তবে একটু বড়বেলার , ক্লাস টেন বা ইলেভেন। স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন একটা নাটক এর প্রস্তুতি চলছে , নাটক এর নাম জিওর্দানো ব্রুনো। তার আবহ সঙ্গীত করেছিল দাদাভাই আর মূল চরিত্রে ছিল দুলু দা। নাটকের আবহ সঙ্গীত পরবর্তী কালে অনেক করেছি, ওই সময় শেখা খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো অনেক কাজে লেগেছে। যে কথা বলছিলাম , এই নাটক এর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সবটাই রেকর্ড করা হয়েছিল Stellaphone এর টেপ রেকর্ডারে। বড় বড় ৮ ইঞ্চি স্পুল, ফোর ট্র্যাক। সত্তর এর দশকের শেষদিকে বাড়িতে এই রকম একটা যন্ত্র নিয়ে কাজ করা আমার কাছে একটা বিরাট পাওয়া। ওই নাটক এর জন্য গীর্জা এর ঘণ্টার আওয়াজ দরকার ছিল। তখন তো ইন্টারনেট ছিল না , তাই লাইভ রেকর্ড করা ছাড়া উপায় নেই , বাড়ির কাছে ব্যান্ডেল চার্চ , সেখানে ঘণ্টা ছিল সেটা বাজত, কিন্তু সেখানে রেকর্ড করতে গেলে অনেক বাড়তি অপ্রয়োজনীয় আওয়াজ চলে আসবে । কিন্তু চার্চ এর ঘণ্টার আওয়াজ তো চাই , নাহলে ইউরোপীয় পরিবেশ কি করে মঞ্চে তৈরী হবে। রূপালী সিনেমা হলে তখন বিধাতা বা দেবতা বলে হিন্দী ছবি চলছে। জানা গেল কোন এক দৃশ্যে গীর্জার ঘণ্টা বাজছে, এমন কিছু আছে। ব্যাস দাদাভাই আর আমি সেই stellaphone টেপ রেকর্ডার আর একটা মাইক্রোফোন নিয়ে পৌঁছে গেলাম রূপালী সিনেমা হলে। সিনেমা হলের ম্যানেজার এর সাথে কথা হল , আমরা পর্দার পেছনে যেখানে বিশাল সাউন্ড হর্ন থাকে সেখানে বসে পড়লাম যন্ত্রপাতি নিয়ে। গীর্জার ঘণ্টা রেকর্ড করা হল। কিন্তু সিনেমার রূপালী পর্দার পিছনে যে ওই রকম ধুলো আর ঝুল জমা হয়ে থাকতে পারে আমার জানা ছিল না। দুজনে ধুলো মেখে ভূত হয়ে বেরোলাম। তারপর ঐ নাটকটা অনেক জায়গায় মঞ্চস্থ হয়েছে । খুব মনে পড়ছে দাদাভাই দল নিয়ে এলাহাবাদ গিয়েছিল এই নাটক মঞ্চস্থ করতে, নাটক এর কোন কম্পিটিশন বা ফেস্টিভ্যাল ছিল । টেপ রেকর্ডারের ছবি গুলো দেখে হুড়মুড় করে কত কি মনে পড়ে গেল। Stellaphone টেপরেকর্ডার এর একটা ছবিও দিলাম ।

No comments:
Post a Comment