Saturday, August 12, 2023

স্মৃতিচারণ ৭ - নিমপীঠ এর কথা

সাল টা ১৯৮৬-৮৭। তখন আমি সদ্য পাস করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার , কাজ করি কুম্ভাণী কনসালট্যান্ট এ। পিনাকীদার আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ,আর দত্তদার মেন্টরিং একটা shell structure ডিজাইন করে ফেলেছিলাম , বারোটা two hinged concrete arch আর salvadori shell এর সমন্নয়ে একটা গোল মত অডিটোরিয়াম । কিন্তু সেটা তো বানাতে হবে , যে ঠিকাদার কাজ করছিল সে ফাউন্ডেশন আর প্লিন্ত্থ বিম বানিয়ে চম্পট দিয়েছে । কুম্ভাণী সাহেব এর মাথায় হাত। দু একদিন বাদে দেখলাম দুজন গেরুয়া পরিহিত সন্ন্যাসী এসেছেন , ওনার সাথে অনেক আলোচনা হল। তারপর একদিন কুম্ভানী সাহেব ডেকে বললেন নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম এ যেতে হবে , ওদের অডিটোরিয়াম বানানোর লোক নেই। এর আগে ওই রকম জায়গায় থাকিনি তার উপর ওটা সুন্দরবন এলাকা । আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা ,,আশ্রম এর স্কুল আর কয়েকটা রিসার্চ সেন্টার ছাড়া কিছুই ছিলনা । আমার আর সুব্রতর ঠাঁই হল আশ্রমের গেস্ট হাউসে। দোতলার ঘর , রাতে মশারী টাঙানো must, না হলেই পোকামাকড় আক্রমন করতে পারে। প্রথম রাতের পরের দিন ঘুম ভাঙলো ভোরের প্রার্থনা সঙ্গীতের শব্দে। অদ্ভুত পরিবেশ । এক মহারাজ একটু পরে এসে বলে গেলেন আশ্রমের ভেতরেই আমাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। শুরু হয়ে গেলে মহারাজদের আপ্যায়ন। ওনারা সন্ন্যাসী মানুষ , শ্রদ্ধেয় , কিন্তু কি অপরিসীম ভালবাসায় আমাদের যত্ন নিতেন , ভালো লেগে গেল জায়গাটা। খুব মন দিয়ে কাজ কম্ম শুরু করে দিলাম। তাছাড়া উপায় ও ছিলনা। কাজ না করলে সময় কাটানো খুব কঠিন হয়ে যেত আমার পক্ষে , যদিও গিটার টা সাথে ছিল , তাও। সে যাই হোক লোকাল মিস্ত্রি জসীমউদ্দীন তার দলবল নিয়ে কাজে লেগে পড়ল। ওদের জন্য structure এর geometry টা বেশ কঠিন ছিল , two hinged parabolic arch, salvadori shell এ সব ব্যাপার ওই সুন্দরবনের মিস্ত্রি জীবনে শোনে নি। Construction site এর ঠিক পাশেই একটা খালি মাঠ ছিল সেই মাঠ সমান করে নিয়ে shuttering এর টেমপ্লেট, staging এর পাইপ এর মাপ করে কাটাকাটি ইত্যাদি শুরু হল । দেখতে দেখতে প্রথম কাস্টিং এর দিন ও এসে গেল ,, সে কি অসম্ভব উত্তেজনা । যেন এক বিশাল মহাযজ্ঞ। কাস্টিং শুরু হলে থামা যাবে না , আর সবটাই ম্যানুয়াল কাজ । স্বামীজী, মহারাজরা মাঝে মাঝে এসে আশীর্বাদ উৎসাহ এক সাথে দিয়ে যেতেন। মাসে একটা করে সেগমেন্ট কাস্ট করা হত একি shuttering form আর staging ব্যবহার করে । এক বছরের অধ্যাবসায় আর সবার উৎসাহে কাজ শেষ হল। তৈরী হল নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রমের ইন্দিরা গান্ধী অডিটোরিয়াম।

এই গল্পটা শোনানোর জন্য কিন্তু এই সব কথা বলছি না । আমার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এর সহপাঠীদের অনেকে এর থেকে অনেক অনেক বড় কাজ করেছে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। আমি আসলে একটা নস্টালজিয়ার কথা বলার জন্য এই সব ভূমিকা করলাম । এবছর জুন মাসের ৭ তারিখ গিয়েছিলাম নিমপীঠ, রাস্তা উন্নত হয়েছে ভীড় বেড়েছে ,কিন্তু ওখানে পৌঁছে দেখলাম সব কিছু কেমন যেন এক রকম রয়ে গেছে । নতুন বিল্ডিং হয়েছে আশ্রমের আসে পাশে, লোক জন বদলে গেছে । বদলায়নি শুধু অনুভূতি , বদলায়নি ওনাদের স্নেহ ভালবাসা। মেরামতি চলছিল , তাও নিজের হাতে গড়া ওই কাজ একবার হাতে ছুঁয়ে এলাম। মহারাজ , কর্মচারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যেন আমাদের আদর যত্নে কোনো ত্রুটি না হয়। অনেক সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছিলাম । তাই গেস্ট হাউসের একটা ঘর তাড়া হুরো করে খুলে দিলেন ওখানকার অফিসের ভদ্রলোক । বললেন " বিশ্রাম করুন , আমি জলখাবার এর ব্যবস্থা করি " । শুরু হল আপ্যায়ন । Breakfast করে চারিদিকে একটু চরতে বেরোলাম । খুব গরম ছিল সেদিন । তাই খানিক বাদেই আবার ac ঘরে ফিরে এলাম । শুয়ে শুয়ে জানলা দিয়ে বাইরে গাছ পালা দেখছিলাম ,, আর ওই দিন গুলোর কথা খুব মনে পড়ছিল । এরপর ডাক পড়ল লাঞ্চ করার । আশ্রমের মধ্যে না , ওনারা ব্যবস্থা করেছেন রিসার্চ সেন্টার এর হলে। গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড । বসার জায়গা সাদা পর্দা দিয়ে ঘেরা , মাঝে ডাইনিং টেবিল, টেবিল ক্লথ বিছানো । খুব লজ্জায় পড়ে গেলাম । এলাহি ব্যবস্থা , বিয়ে বাড়ীর ভোজ এর মত। মহারাজ নিজে দাড়িয়ে থেকে খাওয়ালেন । খাওয়া দাওয়ার পর অনেক গল্প হল সবার সাথে । এরপর বাড়ি ফেরার পালা । ৩৫ বছর আগের সেই স্নেহ , সেই ভালবাসা , সেই একই অনুভূতির আবেশ নিয়ে কলকাতার দিকে পাড়ি জমালাম।।

- অভ্রাজিত 



Tuesday, June 6, 2023

অথর্ব সময়

অথর্ব সময়

আমি জানিনা আমি আজ কতটা উদ্ধত,
আর এই ঔদ্ধত আমি পেয়েছি 
তোমার অকারণ প্রেমে
অস্বীকার করতে পার ? 
পারবে না আজ তুমি
জানিনা তুমি কেন আজ এত নৃশংস,
তবুও তোমার বাগানে আজ ফোটে 
নীল অপরাজিতা, জেগে থাকে 
নির্বাক নীরবতা কথা বলে চলে 
আমার নির্জন মনের সাথে 
সেই নিঠুরতায় যখন ভিজে ওঠে 
তোমার নাভিতল , রক্ত মিছিল করে 
তোমার বুদ্ধি শিবিরে
ফিরে এসো তখন, 
ওষ্ঠে অধর রেখে শান্ত করব তোমায় ।

এইতো সেদিন ,বুকে হাত রেখে বলেছিলে 
তোমার বুকের কালশিটে গুলো নাকি 
সে রাতের হাসনুহানা , তবু আজও জানি না, কেন উন্মাদ হয়েছিলাম,
না হয় একরোখা কোন শেষ নিঃস্বাস

কি যায় আসে তাতে , তুমি ভিজে নিও 
শ্রাবনের ধারার মত, 
তোমায় আমি দিয়ে যাব 
এক পশলা বৃষ্টি না হয়।

পাড়ার মোড়ে ল্যাম্পপোস্টের ছায়া
এখনো আড়াআড়ি ভাবে রাস্তা মাপে , 
আর ওখানে অপেক্ষায় বসিয়ে রেখেছি , 
বন্দী হয়েছে অথর্ব সময় ।।

- অভ্র
তেশরা মে, ২০২৩ 

Friday, April 28, 2023

স্মৃতিচারণ - ৬ চুঁচুড়ার মাঠ , আমার খাতা আর নতুন কলম

এটা কেমন যেন আমি সে ও সখা , সাহেব বিবি গোলাম এর মত শোনালেও ব্যাপারটা খানিকটা ওই রকমই। একটা খাতা , একটা ফাউন্টেন পেন , আর একটা এরোপ্লেনের সাথে আমি একা হলেই হাত নিশপিশ । ক্যাপ্টেন সিট বেল্ট খুলতে বলতেই আমার খাতা কলম বেরিয়ে পড়ল 

কদিন এর জন্য বাড়ী, মানে আমাদের পারিবারিক বাড়ি , আমার বড়ো হয়ে ওঠার জায়গা, চুঁচুড়ায় গিয়েছিলাম । দশ দিন মত ছুটি । Covid এর কৃপায় প্রায় আড়াই বছর ঘরে ফেরা হয়নি । তাই উদ্দীপনা একটু বেশীই ছিল। তাই ঠিক করেছিলাম এবার কটা দিন যাবো শিকড়ের খোঁজে, খানিকটা হলেও যদি ছেলেবেলার সময়টাকে একটু ছুঁয়ে আসার আশায়। খানিক পেলাম ,অনেকটা খুঁজে পেলাম না ।
আমার ছোটবেলার অনেকটা জুড়ে রয়েছে আমাদের মাঠ , এই রকম মাঠ কলকাতার গড়ের মাঠ ছাড়া কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। যারা চুঁচুড়ায় আমার contemporary তাদের কাছে এই মাঠ স্বর্গের চেয়ে কিছু কম ছিল না  । তারা অস্বীকার করতে পারবে না।  গঙ্গার (হুগলী নদী) পাড় থেকে শুরু করে তিন তিনটে ফুটবল মাঠ পেরিয়ে তার পর বাড়ী ঘর শুরু। আমাদের বাড়ীর থেকে গোলাবাগান পেরিয়ে মাধবীতলার গলির পরেই আসত উন্মুক্ত মাঠ, আমরা বলতাম ফার্স্ট মাঠ , এই মাঠের দুটো ফুল স্কেল ক্রিকেট গ্রাউন্ড ছিল , প্রথম টা ছিল ওয়েস্টার্ন গ্রাউন্ড , মাঠের পূর্ব দিকের কোনায় মহসিন কলেজের কানাইলাল হোস্টেল, আর বাঁ দিকে মলয় দের (দাস বাড়ি) , সামনে Woodburn Club , Bengal club এর সবুজ টিন এর টেন্ট, আর পাশে Town Club er লাল বাড়ি। ফার্স্ট মাঠের কোনায় কিছু মহিলা বেশ কিছু লোভনীয় জিনিসের ঝাঁকি নিয়ে বসত, চিনে বাদাম , গুড়ের ক্যান্ডি, ঝাল ছোলা,,আরো কত কি , শীতকালে এর সাথে থাকত পাকা পাকা লাল লাল টোপা কুল এর সম্ভার । ৫ পয়সা পকেটে থাকলেই হল , মনে বেশ একটা রাজা রাজা ভাব দু তিন জন মিলে ভাগ করে সে সব স্বর্গীয় snacks খাওয়া যেত। সেখান থেকে টাউন ক্লাব এর পাস দিয়ে প্রথম ক্রিকেট মাঠ পাড় করলে আসত Northern Ground,, এর পশ্চিম দিকে ডাচ ভিলা , নামে ডাচ ভিলা কিন্তু ওটা ছিল মণ্ডল পরিবারের বাড়ি । আর মণ্ডল বাড়ির গা ঘেঁষে ছিল বক্সিং ক্লাব । আমাদের ওখানে বাড়িগুলো সবাই চিনত পরিবারের নামে , আমাদের সবাই দে বাড়ি বলত , সে রকম ছিল বড় শীলের বাড়ি, বিদু সেন বাড়ি , মুখুজ্জে বাড়ি । ফার্স্ট মাঠের  পর ছিল সেকেন্ড মাঠ, সেটাও একটা গোটা ফুটবল গ্রাউন্ড ,  মাঠের উত্তর প্রান্তে ছিল লাল দীঘি আর আর লালদীঘির ওধারে ছিল অজস্র খিলান ওয়ালা চুঁচুড়া কোর্ট, এই বিল্ডিংটা প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা ছিল । আর সেকেন্ড মাঠের দক্ষিণ দিকে ছিল কাদের সব কোয়ার্টার ,আর অগ্রদুতী ক্লাব । সেগুলো অবশ্য লোপাট হয়ে এখন রবীন্দ্র ভবন হয়েছে। এরপর সেকেন্ড মাঠ পেরোলেই থার্ড মাঠ , যার পোষাকী নাম commissioner's ground  , কারন তার পাশেই বর্ধমান ডিভিশনের কমিশনারের বিশাল বাংলো, আর এই মাঠের অন্য প্রান্তে ছিল আমাদের স্কাউট ডেন , পাশেই একটা টেনিস কোর্ট , সেখানে সব হোমরা চোমরা লোকজন খেলত ,, আমরা দুর থেকে দেখতাম আর নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতাম , আসলে ওনাদের খেলার দৌড় সেইরকমই ছিল ,প্রসঙ্গত মনে পড়ল ওই কোর্টের একটা বল বয় ছিল ,, সে সবার থেকে ভালো টেনিস খেলতে পারতো । আমাদের লোভ ছিল টেনিস বল গুলোর ওপর , রোঁয়া উঠে গেলেই বাতিল হয়ে যেত , আর আমরা এক টাকা দিয়ে কিনে নিতাম , সেগুলো দিয়ে আমাদের পুরো শীতকাল ক্রিকেট খেলা হয়ে যেত। 
সে যাই হোক , এবার আসল গপ্পে ফিরি , যে কারণে মাঠ নিয়ে এত ভূমিকা । সেদিন চুঁচুড়ার বাড়িতে পৌঁছেই কোনোমতে কিছু খেয়ে টো টো করতে বেড়িয়ে পড়লাম ।   মাঠের টান, সে কি উপেক্ষা করা যায়। দিনটা ছিল রবিবার , দেখি জুন মাসের গরম উপেক্ষা করেও অনেক লোক জন মাঠের ধাপি গুলোয় বসে আড্ডা মারছে । কিন্তু অবাক হলাম মাঠের হাল দেখে , সব মাঠ গুলো দেখলাম লোহার বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে , বেশ একটু মনখারাপ হয়ে গেল, Northern Ground, এর ঢালুতে বসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখার ব্যাপারটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আরো মনখারাপ হয়ে গেল পুরোনো ডাচ ভিলা মানে মণ্ডল দের বাড়ির হাল দেখে , এক কোনায় ঝন্টিদা দের অংশটুকু পড়ে আছে বাকি সব ভেঙে বিশাল বিশাল বহুতল বাড়ী,, মনে হল কারা যেন সব দায়িত্ব নিয়ে আমাদের ছোটবেলাটা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। ছোট বেলায় মাঠের ওদিকটায় একটু কাদা জমে থাকত , আর ছোট ছোট কচু পাতার ঝোপ ছিল । আমরা ফড়িং ধরে ওদের কচু পাতা ডাঁটা ভেঙে রস খাওয়াতাম , কে জানে কি হত , ফড়িং গুলোর নেশা হয়ে যেত ,উড়তে পারত না ,, অনেকক্ষণ বসে থেকে তারপর পালাতো ওটাই ছিল আমাদের খেলা। ভাবলাম যাই মাঠের ওই দিকটায় , যদি ফেলে আসা ছেলে বেলার দু একটুকরো খুঁজে পাই , কিন্তু সেই ঘাসের তলায় কাদা, কচু পাতার ঝোপ , আর ফড়িং গুলোর দেখা পেলাম না , হারিয়ে গেছে আধুনিকতার ভারে ।

ইতি
অভ্রজিত 

Tuesday, April 11, 2023

নব বর্ষা


নব বর্ষা

আসুক,তাহলে নব বর্ষা
না হয় ভিজে নেব 
দু এক পশলা
না রাখতে পারা
প্রতিশ্রতি গুলো
নাহয় ধুয়ে যাবে 
সেই বর্ষায় ,
হোক না প্লাবন 
আরো একবার 
সেবারের মত
আমিও কাগজের নৌকায়
ভাসিয়ে দেব এক মুঠো
অকারণ অনুভূতি।।

- ইতি

Tuesday, March 14, 2023

সম্পর্কনামা - ৫

যত বয়স বাড়ছে , দিনে দিনে এক অদ্ভুত ভাবনা চিন্তা পেয়ে বসেছে ,এই সম্পর্কের ব্যাপারে , সম্পর্কের হাব ভাবের ব্যাপারে , যাকে ইংরেজিতে বললে বলা যায়  behaviors of relationship, এটা একদমই একটা randomized phenomenon, আমার নানান পাগলামির মাঝে আর একটা আরকি 

রাজা , আমার বন্ধু একবার আড্ডা মারতে মারতে আমাকে একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল " তুমি না  সব সম্পর্ক জমিয়ে রাখ , আমিও হয়তো রাখি " কথাটা যে এত গভীর তখন বুঝিনি ।  ভাবতে বসে দেখলাম সম্পর্ক জমতে জমতে, পুরনো সম্পর্ক গুলো নতুন সম্পর্কের ভারে সময়ের সাথে সাথে তলিয়ে গেছে , কিন্ত হারিয়ে যায়নি , হারিয়ে যাবেও না । এই সব নানা কথা নানা রকমের ভাবনা , অনেক অনেক স্মৃতি ভেসে ভেসে উঠে আসছে কদিন ধরে তাই এই লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা ।বয়েস বাড়ার সাথে সাথে সেই সম্পর্ক গুলো ভেসে ভেসে ওঠে । একটা বয়েস এর পর মানুষ বোধহয় খুব স্মৃতি রোমন্থন করতে ভালোবাসে । আমিও বা সেই দল থেকে বাদ যাই কেন , পঞ্চাশ এর শেষের দিকে এসে এরকমই হবার কথা।  আমাদের , বিশেষ করে বাঙ্গালীদের একটা ভয়ঙ্কর ভুল ধারনা আছে । সম্পর্ক মানেই ধরে বসি একটা ছেলে আর একটা মেয়ের গল্প । সম্পর্ক যে কোন দুটো এন্টীটী এর মধ্যে হতে পারে। আজ মাস্টারমশাই এর কথা বলব। কদিন ধরে এটা হচ্ছে , রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলেই মনে পড়ছে মাস্টারমশাইকে , গানের মাস্টারমশাই  । না না ,ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই, আমি নিজে কোন দিনই গান শিখিনি, উনি ছিলেন আমার দাদাভাই মনে বড় দাদার গানের গুরু। 

ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি বাড়িতে সবাই গান বাজনা করে, দিদি নাচ শেখে ,, আমি বাড়িতে অনেকটাই ছোট , তাই বিশেষ পাত্তাও পেতাম না ,, আর বুঝতেও পারতাম না গান বাজনা নিয়ে কিছু করা উচিত কিনা। দেখতাম প্রতি মঙ্গলবার গানের ক্লাস হয় , দাদাভাই , বৌদি , মেজদা , সরলা কাকীমা ( মা এর বন্ধু ) গান শেখে , মেজদা স্লাইড গিটার এ রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজানো শেখে। ধুতি আর পাঞ্জাবি পড়া মাস্টার মশাই , মানে সমরেশ চৌধুরী , উনি আসতেন কলকাতা থেকে । আর আমি সব কাজ ছেড়ে দিয়ে ,মানে পড়া শুনা ডকে তুলে ভিজে বেড়ালের মত এক কোনে বসে  যেতাম ওই আসরে। এই ব্যাপারে পুরোপুরি ছাড় ছিল। গান বাজনা তখন কিছুই বুঝতাম না , কিন্তু সময় টা খুব উপভোগ করতাম। দাদাভাই এর এক বন্ধু মুরারীদাও আস্ত গান শিখতে । দাদাভাই আর মুরারীদা সবার মধ্যে ভাল গাইত সেটা বুঝতাম ।মাস্টারমশাই খুবই স্নেহ প্রবন ছিলেন , মনে পরে আমার বড় ভাইঝি কে কোলে বসিয়ে বাকি সবাই কে গান শেখাতেন । কিছু মানুষ থাকেন না , যাদের দেখলেই প্রনাম করতে ইচ্ছা হয় , উনি ছিলেন ওই রকম এক জন ।সাদা ধুতি পাঞ্জাবী ছাড়া অন্য কোন পোষাকে ওনাকে কোন দিন দেখিনি । 

একদিন অপ্রত্যাশিত ভাবে খবর এল , মাস্টারমশাই আর নেই । গঙ্গা স্নান করার সময় হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন , আর তাতেই ওনার জীবনাবসান । যতদুর মনে আছে সেই প্রথম আমি মৃত্যু দেখলাম । বাড়িতে এক ভীষন শোকের ছায়া । মণ্ডল কম্পানির হারমনিয়াম এর উপর মালা , দাদাভাই , মুরারী দা শোক এ মুহ্যমান । বেশ কিছুদিন বাড়িতে গান বাজনা বন্ধ ছিল । শোক কাটিয়ে ওঠার পর আস্তে আস্তে গান বাজনা শুরু হল , দাদাভাই , মুরারী দা কলকাতায় গিয়ে গান শেখা শুরু করল , অশোকতরু বন্দোপাধ্যায় এর কাছে । কিন্ত হারিয়ে গেল গানে ভরা মঙ্গল বারের ওই সন্ধ্যা গুলো। শুধু আমার মনে রয়ে গেছেন মাস্টারমশাই সমরেশ চৌধুরি , শ্রদ্ধার সম্পর্ক হয়ে।

- অভ্র
দুপুর বেলা - ১৪ই মার্চ ২০২৩







Saturday, February 11, 2023

মরলে খবর নিস সেদিন

মরলে খবর নিস সেদিন
----------------------------- 

মরলে খবর নিস 
মরলে মানুষ পবিত্র হয়
আসলে মানুষ তখন ফুল হয়ে যায়,
ঝরে যাওয়া ফুল
কাল আমি ফুল হয়ে যাব
পুরোন শুখনো ফুল
বই এর পাতার মাঝে 
কিম্বা ওই গাছ এর নিচে
কুফ্রি যাবার সময় 
ওখানে তুই চুমু খেয়েছিলি
পাইন গাছের আড়ালে 
না আমি লিখবা না আর
নষ্ট আমি , আমার চোখ
অসুখে সাদা হয়ে গেছে
অ্যারিস্টটল এর মত
তবুও মানুষ চেনা হল না ||

-অভ্র
১১ নভেম্বর ২০২২

Thursday, February 2, 2023

স্মৃতিচারণ - ৫

স্মৃতিচারণ - ৫

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আজকাল অনেক কথা বিশেষ করে ছোটবেলার কথা খুব বেশি করে মনে পড়ে। ছোটবেলার সব স্মৃতি যে মিষ্টি মধুর ভাললাগার হবে ,এমনটা তো নয়। কিছু কিছু কথা এখন যখন মনে পড়ে ,তখন মনে হয় কি ভীষন বোকা ছিলাম তখন ( এখনও যে নই তা কিন্তু বলছি না ) ,তবে ফিরে দেখার একটা চেষ্টা করি এখন। কাল বিকাল থেকে কিছু কথা মনে পড়ছে , তোমরা হয়তো বলবে আদিখ্যেতা , বা লোক দেখানো কথা এসব। 

বেশ কিছদিন হল একটা উপলব্ধি বার বার করে হচ্ছে ,, মানুষ কে সময়োপযোগী হতে হয় ,আর না হলেই বিপদ । পিছিয়ে থাকলে অসুবিধা নেই , one may live in the past merrily,, উদাহরন স্বরুপ বলতে পারি যারা social media ব্যবহার করেন না তারা কি বেঁচে নেই , নাকি তাদের জীবনে কোন শান্তি নেই । কিন্তু সময়ের থেকে এগিয়ে থাকলে , মানে ভাবনা চিন্তা গুলো যদি বর্তমান এর থেকে এগিয়ে থাকে তাহলে সব থেকে বিপদ । না পারা যায় পিছিয়ে যেতে , না কাউকে বোঝানো যায় ভাবনা গুলো ,, এ এক ভীষন কষ্টের ব্যাপার। গ্যালিলিও, কোপারনিকাস , সবাই হয়তো এই কষ্ট পেয়েছেন, অসময়ে মৃত্যুও বরণ করেছেন । এই উপলব্ধিটা হল প্রায় তিন কুড়ি পেরিয়ে আসার । 

আমার ছোটবেলাটা আর পাঁচটা বাচ্চা ছেলেদের মত ছিল না । আমি আমাদের বংশের সব থেকে ছোট সন্তান আমার দাদারা দিদিরা অনেক বড় বড় ছিল । আমার নিজের সব থেকে বড় ভাই ছিল আমার থেকে ২৩ বছরের বড় । মেজদা ছিল ১৯ বছরের বড়। আর ছোড়দা ১৭ বছর , দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল যখন আমি ক্লাস থ্রি। এই রকম বাড়ির পরিবেশে আমি বড় হয়েছি । আমার দাদাভাই , মানে সব থেকে বড় দাদা ছিল অলরাউন্ডার। দাদাভাই কলেজে chemistry পড়াতো কিন্ত Photography, Cricket, গান বাজনা সব ব্যাপার এ সমান ভাবে পারদর্শী ছিলেন। পড়াশুনার  সাথে সাথে বাকি যা যা শিখেছি সবই দাদাভাই এর প্রচেষ্টায়। আজ ভাবলাম আমার ফোটোগ্রাফি নিয়ে কেরামতির গল্প একটু করি ।

ছোটবেলায় আমাদের স্কুলের সেশান জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর অবধি হত । বড়দিন এর আগেই রেসাল্ট ইত্যাদির পালা মিটে  যেত । তারপর পুরো ছুটি জুড়ে মজা । সেট ছিল ১৯৭০ সাল এর ডিসেম্বর , ক্লাস ২ শেষ হল । বড়দিন এর দুদিন আগে সন্ধ্যেবেলায় দাদাভাই একটা বাক্স আমার হাতে দিয়ে বলল " নে এবার নিজের মত করে শুরু কর " , আমি বেশ অবাক কি আছে বাক্সতে জানি না , সেদিন দাদার বন্ধু , আমাদের সবার প্রিয় রোজি দা মিটি মিটি হাসছে ( পুরো নাম ক্লিফারড রোজারিও , গোয়ানিস ক্যাথালিক , রোজি দার গল্প অন্য দিন) । বিছানার উপর বাবু হয়ে বসে খুব সাবধানে বাক্স টা খুলতে আমার চক্ষু ছানা বড়া , দেখি একটা ক্যামেরা , আগফা ক্লিক থ্রি , জীবনের প্রথম ক্যামেরা । সাথে একটা ১২০ ফিল্ম, খুব সম্ভবত ORWO NP 22 ছিল । পরের দিন ছাদ এ চন্দ্রমল্লিকার ছবি দিয়ে শুরু হল আমার ফোটোগ্রাফী চর্চা। তারপর আর থামিনি। সেবছর মানে ১৯৭১ সালে মা এর ঠাকুরবাড়ির বন্ধুরা সবাই মিলে পুরী বেড়াতে গিয়েছিল । আমিও গিয়েছিলাম সেই দলের সাথে । হাতে  ক্যামেরা , আমার প্রথম আউটডোর র‍্যাম্বলিং বলে কথা , আমি যতটা এক্সাইটেড , দাদাভাই তার চেয়েও বেশি বলল " খাতা নিয়ে আয় একটা " , দৌড়ে একটা পাতলা সাদা পাতার খাতা নিয়ে আমি হাজির। দাদাভাই এক এর পর এক ফ্রেম ( চৌকোনা ) বানিয়ে তাতে সমস্ত কম্পসিশন এঁকে দিল , " এই রকম ভাবে ছবি গুল তুলবি " , আমি দুটো রোল সেই কথা মত মেনে ছবি তুললাম , সমুদ্রের ছবি , পুরীর মন্দির এর ছবি , কোনারক , উদয় গিরি , খন্ডগিরি সব ক্যামেরা বন্দী হয়ে ফিরে এল চুঁচড়ায় । 

আজ সেই খাতাটা হারিয়ে গেছে , সেই নেগাটিভ গুলো দাদাভাই এর আর্কাইভ এ ছিল , আর ছবির অ্যালবাম ছিল মায়ের আলমারীতে, সে সব হয়ত আর খুজে পাব না, কিন্তু এখনও ,যখনি ল্যান্ডস্কেপ তোলার জন্য ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখি ওই পাতলা খাতার সাদা পাতায় আঁকা ফ্রেম গুলো মনে পড়ে যায়। তখন থিওরি জানতাম না , দাদাভাই যা কিছু শিখিয়েছে, এমন ভাবেই শিখিয়েছে,  তাই হয়ত চিরকাল এর মত সে গুলো knowledge হয়ে মাথায় রয়ে গেছে । 

অভ্র
২রা ফেব্রুয়ারী ২০২৩