Thursday, February 2, 2023

স্মৃতিচারণ - ৫

স্মৃতিচারণ - ৫

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আজকাল অনেক কথা বিশেষ করে ছোটবেলার কথা খুব বেশি করে মনে পড়ে। ছোটবেলার সব স্মৃতি যে মিষ্টি মধুর ভাললাগার হবে ,এমনটা তো নয়। কিছু কিছু কথা এখন যখন মনে পড়ে ,তখন মনে হয় কি ভীষন বোকা ছিলাম তখন ( এখনও যে নই তা কিন্তু বলছি না ) ,তবে ফিরে দেখার একটা চেষ্টা করি এখন। কাল বিকাল থেকে কিছু কথা মনে পড়ছে , তোমরা হয়তো বলবে আদিখ্যেতা , বা লোক দেখানো কথা এসব। 

বেশ কিছদিন হল একটা উপলব্ধি বার বার করে হচ্ছে ,, মানুষ কে সময়োপযোগী হতে হয় ,আর না হলেই বিপদ । পিছিয়ে থাকলে অসুবিধা নেই , one may live in the past merrily,, উদাহরন স্বরুপ বলতে পারি যারা social media ব্যবহার করেন না তারা কি বেঁচে নেই , নাকি তাদের জীবনে কোন শান্তি নেই । কিন্তু সময়ের থেকে এগিয়ে থাকলে , মানে ভাবনা চিন্তা গুলো যদি বর্তমান এর থেকে এগিয়ে থাকে তাহলে সব থেকে বিপদ । না পারা যায় পিছিয়ে যেতে , না কাউকে বোঝানো যায় ভাবনা গুলো ,, এ এক ভীষন কষ্টের ব্যাপার। গ্যালিলিও, কোপারনিকাস , সবাই হয়তো এই কষ্ট পেয়েছেন, অসময়ে মৃত্যুও বরণ করেছেন । এই উপলব্ধিটা হল প্রায় তিন কুড়ি পেরিয়ে আসার । 

আমার ছোটবেলাটা আর পাঁচটা বাচ্চা ছেলেদের মত ছিল না । আমি আমাদের বংশের সব থেকে ছোট সন্তান আমার দাদারা দিদিরা অনেক বড় বড় ছিল । আমার নিজের সব থেকে বড় ভাই ছিল আমার থেকে ২৩ বছরের বড় । মেজদা ছিল ১৯ বছরের বড়। আর ছোড়দা ১৭ বছর , দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল যখন আমি ক্লাস থ্রি। এই রকম বাড়ির পরিবেশে আমি বড় হয়েছি । আমার দাদাভাই , মানে সব থেকে বড় দাদা ছিল অলরাউন্ডার। দাদাভাই কলেজে chemistry পড়াতো কিন্ত Photography, Cricket, গান বাজনা সব ব্যাপার এ সমান ভাবে পারদর্শী ছিলেন। পড়াশুনার  সাথে সাথে বাকি যা যা শিখেছি সবই দাদাভাই এর প্রচেষ্টায়। আজ ভাবলাম আমার ফোটোগ্রাফি নিয়ে কেরামতির গল্প একটু করি ।

ছোটবেলায় আমাদের স্কুলের সেশান জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর অবধি হত । বড়দিন এর আগেই রেসাল্ট ইত্যাদির পালা মিটে  যেত । তারপর পুরো ছুটি জুড়ে মজা । সেট ছিল ১৯৭০ সাল এর ডিসেম্বর , ক্লাস ২ শেষ হল । বড়দিন এর দুদিন আগে সন্ধ্যেবেলায় দাদাভাই একটা বাক্স আমার হাতে দিয়ে বলল " নে এবার নিজের মত করে শুরু কর " , আমি বেশ অবাক কি আছে বাক্সতে জানি না , সেদিন দাদার বন্ধু , আমাদের সবার প্রিয় রোজি দা মিটি মিটি হাসছে ( পুরো নাম ক্লিফারড রোজারিও , গোয়ানিস ক্যাথালিক , রোজি দার গল্প অন্য দিন) । বিছানার উপর বাবু হয়ে বসে খুব সাবধানে বাক্স টা খুলতে আমার চক্ষু ছানা বড়া , দেখি একটা ক্যামেরা , আগফা ক্লিক থ্রি , জীবনের প্রথম ক্যামেরা । সাথে একটা ১২০ ফিল্ম, খুব সম্ভবত ORWO NP 22 ছিল । পরের দিন ছাদ এ চন্দ্রমল্লিকার ছবি দিয়ে শুরু হল আমার ফোটোগ্রাফী চর্চা। তারপর আর থামিনি। সেবছর মানে ১৯৭১ সালে মা এর ঠাকুরবাড়ির বন্ধুরা সবাই মিলে পুরী বেড়াতে গিয়েছিল । আমিও গিয়েছিলাম সেই দলের সাথে । হাতে  ক্যামেরা , আমার প্রথম আউটডোর র‍্যাম্বলিং বলে কথা , আমি যতটা এক্সাইটেড , দাদাভাই তার চেয়েও বেশি বলল " খাতা নিয়ে আয় একটা " , দৌড়ে একটা পাতলা সাদা পাতার খাতা নিয়ে আমি হাজির। দাদাভাই এক এর পর এক ফ্রেম ( চৌকোনা ) বানিয়ে তাতে সমস্ত কম্পসিশন এঁকে দিল , " এই রকম ভাবে ছবি গুল তুলবি " , আমি দুটো রোল সেই কথা মত মেনে ছবি তুললাম , সমুদ্রের ছবি , পুরীর মন্দির এর ছবি , কোনারক , উদয় গিরি , খন্ডগিরি সব ক্যামেরা বন্দী হয়ে ফিরে এল চুঁচড়ায় । 

আজ সেই খাতাটা হারিয়ে গেছে , সেই নেগাটিভ গুলো দাদাভাই এর আর্কাইভ এ ছিল , আর ছবির অ্যালবাম ছিল মায়ের আলমারীতে, সে সব হয়ত আর খুজে পাব না, কিন্তু এখনও ,যখনি ল্যান্ডস্কেপ তোলার জন্য ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখি ওই পাতলা খাতার সাদা পাতায় আঁকা ফ্রেম গুলো মনে পড়ে যায়। তখন থিওরি জানতাম না , দাদাভাই যা কিছু শিখিয়েছে, এমন ভাবেই শিখিয়েছে,  তাই হয়ত চিরকাল এর মত সে গুলো knowledge হয়ে মাথায় রয়ে গেছে । 

অভ্র
২রা ফেব্রুয়ারী ২০২৩

No comments:

Post a Comment