Saturday, June 21, 2025

কৌশানী এর কথা


পাহাড়, ঝাউবন , দেওদার আর তার সাথে মেঘের  আনাগোনা। মাঝে মধ্যে দু একপশলা হালকা বৃষ্টি। ভাগ্যিস কবিতা লিখতে পারি না , নাহলে কি কান্ড যে হত, এমন পরিবেশে কাব্যের  বন্যা বয়ে যেত। সে যাই হোক বিকালের দিকে চা খেতে বসে দেখলাম দূরে পাহাড়ের গায়ে একটা রামধনু তৈরি হতে শুরু করল, কিন্তু খানিক বাদে কি মনে হল তার কে জানে, আস্তে আস্তে হালকা মত হয়ে মিলিয়ে গেল। বিকাল বেলা, পাখিদের বাড়ি ফেরার সময়। দুটো ছোট্ট ছোট্ট পাখি সামনের আকাশে অনেকক্ষন ধরে খেলে টেলে বাড়ি চলে গেল। রিসর্ট এর ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিটা খুব লোভনীয়। দুপুর বেলা লাঞ্চ এর পর একটু বিছানায় ওলটপালট করে , এখানেই বসে আছি। কৌশানি জায়গাটা বেশ পছন্দ হয়েছে। একদম শোরগোল নেই। তাই পা ছড়িয়ে পাহাড় এর সাথে মেঘের রেষারেষি বেশ লাগছিল। বৃষ্টি এলো , দূরে উপত্যকায় কিন্তু রোদ্দুর। এই রকম শান্ত জায়গায় এক চুপ করে বসে নানা রকমের ভাবনা ভাবা যায়, যা আমাদের শহুরে জীবনে খুবই দুষ্প্রাপ্য ব্যাপার একটা। কৌশানীতে এবারের মত আজ শেষ সন্ধ্যা। কাল নেমে যাব জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কে। তাই মনটা একটু কেমন, ভারী বা উদাস না, আরো একটা দিন থাকলে তৃপ্তিটা একটু বেশী হত। আমাকে সাধারণত সমুদ্র বেশি টানে। কিন্তু এবার কৌশনীতে এসে একটা অন্য ভালো লাগা পেলাম। বয়স হচ্ছে, মন হয়ত শান্ত পরিবেশ পছন্দ করতে শুরু করেছে,, এটা কি হিসাব মেলানোর সময় এর ইঙ্গিত।
পুনশ্চ: আমার পদযুগল মোটেই দেখার মত কোন বস্তু না , শুধুমাত্র ফটোগ্রাফির ভাষায় "depth of field" ব্যাপারটা ,, ওই আরকি ফোরগ্রাউন্ড অবজেক্ট,,,😃😃

Sunday, June 1, 2025

স্মৃতিচারণ -১৮ - টেপ রেকর্ডার

গতকাল হঠাৎ করে ইচ্ছা হলো একটু অকারণ browse করি। অনর্থক খোঁজা খুঁজি, মাঝে মাঝে করি, এরকম করতে করতে অনেক সময় নতুন কিছু খুঁজে পাই, পড়ে ফেলি, কিছু না কিছু নতুন জ্ঞান তো লাভ হয় । এই নতুন কিছু খুঁজে বেড়ানোর নেশাটা দাদাভাই এর কাছ থেকে পাওয়া। ছোটবেলায় নানারকমের বই নিয়ে এসে আমাদের দিতো , তখন স্ট্যান্ডার্ড লিটারেচার বলে একটা বই এর প্রতিষ্ঠান ছিল , তার দেশ বিদেশের অনেক অনেক বই এর সম্ভার বাড়িতে পৌঁছে দিত। সেই বই গুলোর মধ্যে আমার খুব প্রিয় ছিল "Popular Science " , দশ ভলিউম এর মোটা মোটা বই। বিজ্ঞান এর নানা তথ্য  ঠাসা সেই বই গুলো ছিল আমার মনের দৌড়ে বেড়ানোর তেপান্তরের মাঠ। আর তার সাথে ছিল নানা রকমের এক্সপেরিমেন্ট করার উৎসাহ, সেটা অবশ্যই দাদাভাই জোটাত। তার ফলে অনেক কম বয়েসেই নানা রকমের ব্যাপার স্যাপার শিখে ফেলেছিলাম। এই সব এর সাথে সাথে দাদদভাই এর গান বাজনার চর্চা ছিল। রবীন্দ্র চর্চা আমাদের দিন যাপন এর একটা বিশেষ অঙ্গ ছিলো। যেহেতু গান বাজনা এর চর্চা ছিলো তাই বাড়িতে বেশ কিছু যন্ত্র পাতি ও ছিল। তার মধ্যে আমার স্পুল টেপরেকর্ডার ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যজনক লাগত। একটা চাকা থেকে আর একটা চাকায় খয়েরি রঙের ফিতে গুটিয়ে নেয় , তাতে গান রেকর্ড হয়ে যায়, সেটা আবার পরে চালিয়ে শোনা যায়। কিন্তু কেন এই সবি গাল গল্প করছি, এর সাথে ইন্টারনেট ব্রাউজ করার ই বা কি সম্পর্ক ?? বলছি সেই কথা । গতকাল ব্রাউজ করতে করতে হঠাৎ মনে হলো স্পুল টেপরেকর্ডার সার্চ করি ,, অনেক মডেল এর টেপরেকর্ডার এর হদিস পেলাম। একটু একটু জিয়া নস্টাল যে হচ্ছিল না তা নয়। হঠাৎ করে দুটো মডেল এর ছবি পেলাম , যে দুটো আমি ছোটবেলায় অনেক নাড়াচাড়া করেছি। এই প্রসঙ্গে দুটো স্মৃতি মনে এলো। সেগুলোর কথা বলি একটু 

প্রথম গল্পঃ 

আমাদের পাড়ায় একটা মাঠ ছিল , সেই মাঠে একটা তালগাছ ছিল। তাই মাঠের নাম ছিল তালতলা। আমাদের বড় বাড়ির লাগোয়া ছোট্ট মাঠ। সকালে আমরা সেখানে ক্রিকেট , ডাংগুলি খেলতাম , আর শীতকালে সন্ধ্যাবেলা মেজদা আর বন্ধুরা মিলে বড় বড় আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলত। আর মাঝে মাঝে স্টেজ বেঁধে নাটক বা গানের অনুষ্ঠান হত। আর আমার দাদাভাই এর কালচারাল ক্লাব ছিল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশান, এখানে গান নাটক আবৃত্তি এই সব নিয়ে চর্চা হত। সেবার তালতলায় নাটক হবে , তখন আমি বোধহয় ৫ কি ৬। আমার ডাক পড়ল, কোন এক ছোট ছেলের চরিত্রে অভিনয় করতে হবে । ওই আর কি , স্টেজে দাঁড়ানর রোল । তাও উৎসাহের অভাব নেই , রীতিমত রিহার্সাল দেওয়া চলল। কিন্তু ভাগ্য খারাপ , অনুষ্ঠানের দু দিন আগে জ্বর আসল আমার, ধুম জ্বর। আমাদের ফ্যামিলি ফিসিসিয়ান ডাঃ ক্যাপ্টেন দাস এর কড়া নির্দেশ, বাড়ি থেকে বাইরে  যাওয়া তো  ডুরের কথা , বিছানা থেকে নামা নিষিদ্ধ হয়ে গেল। খুব মনখারাপ , কত আর বই পড়া । আমার মন মেজাজ থিক করতে দাদাভাই একটা ছোট্ট তিন ইঞ্চি স্পুলের টেপ রেকর্ডার আমাকে দিয়ে গেল। ব্যাস সব মন খারাপ একদম জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে লেগে পড়লাম ওই অবাক করা যন্ত্র নিয়ে। জ্বরের কষ্ট, নাটক না যেতে পারা , সব দুঃখ এক নিমেষে উধাও। সেটা ছিল ফিলিপ্স এর তৈরি একটা পোর্টেবল স্পুল টেপ রেকর্ডার । নিচের ছবিটার মত ছিল সেটা । এখন ভাবতে বেশ অবাক লাগে, ব্যাট বল , ক্যাপ ফাটানো বন্দুক ইত্যাদির থেকে এই সব নিয়ে খেলতে বেশি ভাল লাগত।




দ্বিতীয় গল্পঃ 

এই গল্পটাও টেপ রেকর্ডার নিয়ে , তবে একটু বড়বেলার , ক্লাস টেন বা ইলেভেন। স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন একটা নাটক এর প্রস্তুতি চলছে , নাটক এর নাম জিওর্দানো ব্রুনো। তার আবহ সঙ্গীত করেছিল দাদাভাই আর মূল চরিত্রে ছিল দুলু দা। নাটকের আবহ সঙ্গীত পরবর্তী কালে অনেক করেছি, ওই সময় শেখা খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো অনেক কাজে লেগেছে। যে কথা বলছিলাম , এই নাটক এর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর সবটাই রেকর্ড করা হয়েছিল Stellaphone এর টেপ রেকর্ডারে। বড় বড় ৮ ইঞ্চি স্পুল, ফোর ট্র্যাক। সত্তর এর দশকের শেষদিকে বাড়িতে এই রকম একটা যন্ত্র নিয়ে কাজ করা আমার কাছে একটা বিরাট পাওয়া। ওই নাটক এর জন্য গীর্জা এর ঘণ্টার আওয়াজ দরকার ছিল। তখন তো ইন্টারনেট ছিল না , তাই লাইভ রেকর্ড করা ছাড়া উপায় নেই , বাড়ির কাছে ব্যান্ডেল চার্চ , সেখানে ঘণ্টা ছিল সেটা বাজত, কিন্তু সেখানে রেকর্ড করতে গেলে অনেক বাড়তি অপ্রয়োজনীয় আওয়াজ চলে আসবে । কিন্তু চার্চ এর ঘণ্টার আওয়াজ তো চাই , নাহলে ইউরোপীয় পরিবেশ কি করে মঞ্চে তৈরী হবে। রূপালী সিনেমা হলে তখন বিধাতা বা দেবতা বলে হিন্দী ছবি চলছে। জানা গেল কোন এক দৃশ্যে গীর্জার ঘণ্টা বাজছে, এমন কিছু আছে। ব্যাস দাদাভাই আর আমি সেই stellaphone টেপ রেকর্ডার আর একটা মাইক্রোফোন নিয়ে পৌঁছে গেলাম রূপালী সিনেমা হলে। সিনেমা হলের ম্যানেজার এর সাথে কথা হল , আমরা পর্দার পেছনে যেখানে বিশাল সাউন্ড হর্ন থাকে সেখানে বসে পড়লাম যন্ত্রপাতি নিয়ে। গীর্জার ঘণ্টা রেকর্ড করা হল। কিন্তু সিনেমার রূপালী পর্দার পিছনে যে ওই রকম ধুলো আর ঝুল জমা হয়ে থাকতে পারে আমার জানা ছিল না। দুজনে ধুলো মেখে ভূত হয়ে বেরোলাম। তারপর ঐ নাটকটা অনেক জায়গায় মঞ্চস্থ হয়েছে । খুব মনে পড়ছে দাদাভাই দল নিয়ে এলাহাবাদ গিয়েছিল এই নাটক মঞ্চস্থ করতে, নাটক এর কোন কম্পিটিশন বা ফেস্টিভ্যাল ছিল । টেপ রেকর্ডারের ছবি গুলো দেখে হুড়মুড় করে কত কি মনে পড়ে গেল। Stellaphone টেপরেকর্ডার এর একটা ছবিও দিলাম । 

মাঝে মাঝে স্মৃতির পাতা ওল্টাতে বেশ লাগে, তাই না।