একদম ছোটবেলায় ভাবতাম না সে ভাবে কি পারি আর কি পারি না। তারপর একটু বড় হলাম , ওই ক্লাস সেভেন এইট এ পড়ার সময় , সাঁতার কাটতে পারতাম, সাইকেল চালাতে পারতাম , ছবি আঁকতে পারতাম, সাথে সাথে দাদাভাই এর পেন্ট্যাক্স এসএলআরে লম্বা টেলিফটো লেন্স লাগিয়ে ছবিও তুলতাম , আবার দরকার হলে ডার্ক রুমের কাজও করতে পারতাম, এমনকি দু চারটে ট্রানজিস্টর , ক্যাপাসিটির , রেজিস্টর সোল্ডার করে "একটা জিনিষ " বানাতেও পারতাম । আর সাথে ছিল স্কাউটিং, জ্যাকসন কাপ , স্যাটা বোস কাপ জেতা স্কাউট ট্রুপ এর সদস্য হিসাবে নিজেকে মনে করতাম আমি একটা বিশাল হনু।তাই মনে মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা কালো অজগরের মতো আস্তানা গেড়েছিল, ভাবতাম আমি অনেক কিছু পারি, তাই আমি অন্যদের থেকে এক নয় দুই নয়, বেশ কয়েক কাঠি উপরে। আমার মতো এত কিছু পারা অনেকেই পারে না। আর এই সব ভাবনা থেকে একটা ভয়ংকর "ম্যা হু হিরো" কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছিল। একটা ক্ষীণকায় ছেলে, আন্ডারওয়েট, তাই নিয়ে মোস্তানি করে চলতাম। যার ফলস্বরূপ আমার সেভাবে কোনো বন্ধু ছিল না, তখন বুঝতাম না, এখন বুঝতে পারি ওরা আমাকে কেন পছন্দ করতো না।
ক্লাস নাইনের একটা পরীক্ষায় এডিশনাল ম্যাথমেটিক্সে ১০০ এর মধ্যে ১৩ পেলাম। সেটা ছিল আমার অহংকারের গোড়ায় প্রথম ঘা। তবে ধাক্কা খেলেও সামলে যাবার মাল তো আমি ছিলাম না। সবজান্তা ভাব একটুও কমলো না। অঙ্কের মাস্টারমশাই বাড়িতে ডেকে পড়ানো শুরু করলেন, তখন বুঝলাম আমি কি প্রকৃতির গাধা। ততদিনে সিগারেট টানতে শিখে গেছি, ক্লাস টেনের শুরুর দিকে সরস্বতী পুজো, স্কুলে ক্লাস টেনের ছেলেরা পুজো সামলাতো, আমিও যোগ দিলাম ( স্মারজিতের কথা খুব মনে পড়ছে, একসাথে মিলে পুজোর আগের রাতে অনেক দুষ্টুমি করেছিলাম, ৪৭ বছর হয়ে গেছে, স্মৃতি মুছে যায়নি এক ফোঁটাও, কিন্তু স্মারজিত আর নেই, কোভিডের সময় চলে গেছে না ফেরার দেশে )। তারপরে গরমকালে জন্ডিস হলো, রোগা তো ছিলামই ,খ্যাংড়া কাঠির মতো হয়ে গেলাম। তখন সব ছেড়ে দিয়ে টেবিল টেনিস খেলতে শুরু করেছিলাম, সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। অবশেষে পড়াশোনার দিকে একটু মন হলো। অঙ্ক ভালোবেসে ফেলেছি ততদিনে। শরীর খারাপ হলে কি হবে, আমি পঙ্খীরাজ বাইসাইকেল চড়ে রাজ্য জয় করে বেড়াতাম। বয়সের ধর্মে যা হয়, বাণীমন্দিরের লাল-সাদা ইউনিফর্ম আমাদের চোখ ধাঁধানো, মাথা ঘোরানো শুরু করে দিয়েছিল। তখন একবারও মনে হতো না যে আমার চেহারা চিন্ময় রায়ের মতো, কী দুর্ভাগ্য, ওই সময় যদি একটু সুমতি হতো, হয়তো জীবনটা অন্যভাবে গড়তে পারতাম। যাইহোক, এর মধ্যে আবার ফটোগ্রাফি ক্লাব শুরু হয়েছে, আমি সব থেকে ছোট সদস্য, ১৬ বছর বয়স, বাকিরা সব দাদাভাইয়ের বয়েসী, সবাই প্রায় ২০ বছর বড়। কিন্তু তাতে কী আসে গেল, নিজেকে আমি কেউকেটা ভাবতে শুরু করেছি। চুঁচুড়া ছোট জায়গা, সবাই সবাইকে চিনতো। যেহেতু কলেজিয়েট স্কুলে পড়তাম, একটু নাম ডাক ছিল, তার সঙ্গে কী কী পারি তার তালিকা লম্বা হওয়াতে আমার ল্যাজটা ভালোই মোটা হয়ে গিয়েছিল।
এই সব করতে করতে মাধ্যমিক, মোটামুটি ভালো রেজাল্ট হলো, এগারো-বারো পারিয়ে, জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিলাম, বি ই কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেলাম। মফঃস্বলের ছেলে, বি ই কলেজে গিয়ে অহংকার খুব বেড়ে গেল, মাথার মধ্যে সেই কালো অজগরটা ততদিনে আরও বেড়ে উঠেছে। মাথায় ছিল না যে বি ই কলেজে সবাইই আমার মতো অথবা আমার থেকে অনেক অনেক বেশি গুণী মানুষ। এইসব বোধবুদ্ধি থাকলে কি মানুষ, এইসব কাণ্ড কারখানা করে। মানুষ এর শোধরানোর সময় কলেজ আর হোস্টেল লাইফ , আমার উল্টো হলো বি ই কলেজ থেকে বেরিয়ে প্রফেশনাল লাইফ , সেই জীবনের ৪০ বছর পেরিয়ে আসার আমার আজ এই উপলব্ধি হয়েছে , যেগুলো পারি বলে ভাবতাম সেগুলোর ব্যাপারে আমি একদম মাঝারি ধরনের। মাঝে মনে হয়েছিল লেখা লিখি পারি, এমন ভাবার যথেষ্ট কারণও আছে, বন্ধু বান্ধবরা আমার লেখা পড়ে হাততালি দিত, রেডিওতেও অনুষ্ঠান হল আমার লেখা নিয়ে , আমি আবার ভাবতে লাগলাম আমি বিরাট কিছু করে ফেলেছি। দু একটা রেকর্ডিং আর অনুষ্ঠানে বাজিয়ে নিজেকে বিশাল গীটারিস্ট ভাবতাম , গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ছবি তুলে নিজের কাজে নিজেই বাহবা দিতাম । কিন্তু এই তিন কুড়ি পেরিয়ে এসে বুঝলাম আমি আসলে কিছুই পারিনা । এগুলো সব ভরং, আসল জায়গায় হিসাবের খাতায় সব লোক দেখানো হিসাব। আসল পারা যেটা সেটা হলো মানুষকে হ্যাপি করা , আমার আশেপাশে যারা থাকে তারা কেউই খুশি না । নিজের মধ্যে উঁকি মেরে দেখলাম আমি নিজেই একটা empty bottle and a broken song ,, নিজেও খুশি মানুষ নয়। এমন অখুশি জীবন আরো কতদিন টানতে হবে কে জানে।
No comments:
Post a Comment