Saturday, February 29, 2020

সম্পর্কনামা ১ - উনি


হঠাৎ সকাল বেলা এক প্রশ্ন উড়ে এলো আন্তর্জালে
" ইনি কে ? " …. এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ কি ? চেষ্টা করতে ক্ষতি কি , তাই না 
উনি আমার খুবই কাছের মানুষ ,, উনি ও আমাকে তাই মনে করেন বলেই জানি, উনি খুব ভালো কবিতা লেখেন , আর খুব ভালো ভালোবাসতেও  জানেন . এনার হাতের রান্না খাবার সুযোগ না হলেও , রান্না করা খাবার এর ছবি দেখে, জিভে জল এসে যায়। 
বিদুষী মানুষ উনি ,, অনেক পড়াশুনা ,, রবীন্দ্র ভক্ত ,, রবি ঠাকুরের কাজ সমস্তটা ইনি আত্মস্থ করেছেন ,, যা সাধারণ মানুষের এক জীবনের কম্ম না , গান ভীষণ ভালবাসেন , আর ভালবাসেন কলকাতাকে ভীষণ ,, কম পক্ষে বছরে তিন চার বার কলকাতায় কদিন কাটিয়ে যান।  খুব সুন্দর করে সাজতে পারেন উনি  আর পারেন ভালবাসতে একদম অকারণে ,,আর কার কাছে উনি কি আমি জানি না, তবে আমার কাছে উনি এক ভালবাসার আকাশ,( বেশ বোকা বোকা শোনাচ্ছে , তা শোনাক ),, এই ভালবাসার অবশ্য কোনো নাম ধাম নেই ,,সে যাই হোক ,, আমি তো সব সময় এটা মনে করি  যে এমন একজন মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া সব মানুষের ভাগ্যে হয় না।
তবে পৃথিবীর সব জায়গাটা জুড়ে সব সময় শুধু গোধূলি , তা তো হয় না , গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে , তারপর রাত নামে ,, রাতের সাথে আসে গভীর গহন অন্ধকার,, ওনার সাথে আমার সম্পর্কেও " চক্রবৎ পরিবর্তন্তে দুঃখাণি চ সুখানি চ,, " ,, কারনে অকারনে (বেশীর ভাগটাই অকারনে ) তুমুল ঝগড়া বেঁধে যায় ,, সপ্তম সুরে গলাবাজি ,, " তুমি ঘৃণ্য , তুমি পাতক , তুমি অভিশপ্ত ,," এই সব নানা কথার মিসাইল আমার উপর এসে পড়ে,, আমার তখন ওই মধ্য প্রাচ্যের গরীব দেশের মত হাল হয়ে পড়ে ,, গোলা বর্ষণ শেষ হলে , চারিদিক অদ্ভুত শান্ত হয়ে পড়ে , শুধু থাকে হাওয়ায় মন জ্বলে যাওয়া পোড়া গন্ধ ,, এলোপাথাড়ি গোলা বর্ষণ এর পর সব শান্ত আর ভারী বুট এর শব্দ আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে , , তারপর চালু হয়  " post war incommunicado| " , কখনো তিনদিন, কখনো তিন সপ্তাহ , যোগাযোগ হীন অবস্থা , সব রকমের কথার আদান প্রদান এক্কেবারে বন্ধ , whatsapp এ কারফিউ।  কিন্তু তখন চলতে থাকে বোবা কথা , মুখে নয় , আঙ্গুল দিয়ে নয় , মন দিয়ে চলতে থাকে রাজ্যের কথা বার্তা। এমন চলতে চলতে প্রাণ যখন প্রায় হতাশ , সেই সময় একটা ছোট্ট টেক্সট " ভালো আছো ? আমাকে মিস করছ কি ? " .. আমার্ উত্তর " হুঁ বল , আমি ভালো আছি ,তুই ? "  এই মুহূর্তের অপেক্ষা থাকে দুজনেই , প্রতিবার ,, তারপর যুদ্ধ শেষ , সব ভুলে  ফিরে যাই , সমস্ত জমা কথা প্রায় এক লহমায় বলার চেষ্টায় সব ভেসে যায় ,কিছুই সেভাবে বলা হয়ে ওঠে না। সমস্ত রাগ অভিমান ভেসে যায় এই ইটার্নাল জোয়ারে।
সাধারণ ভাবে পড়লে মনে হতে পারে এটা একটা প্রশংসা পত্র , কেউ বা ভাবতে পারে এ এক নব্য প্রেমপত্র  .... সে যে যা ভাবে ভাবুক না , আমার তাতে কি , আমি বলি এ শুধু নতুন করে ব্যক্ত করা এক  সম্পর্কনামা ,,, যে সম্পর্কের কোন নাম নেই , তবুও সে ভীষণ ভাবে বর্তমান ,,, হোক না সে রকম , নাই দিলাম কোনো নাম ,, আকাশের তো অনেক নাম , ভেবে নিও কোন একটা ,,,


অভ্র 
২৯ শে  ফেব্রুয়ারি ২০২০


Friday, February 21, 2020

কলম কথা




কলম কথা
গত বছর কোনো একটা সেলিব্রেশন এর সময় একটা sheaffers  এর একটা ফাউন্টেন পেন পেয়েছিলাম। বলতে গেলে আজকাল কম্পিউটার , মোবাইল ফোন আমাদের কাগজ-কলম এ লেখার আনন্দ প্রায় করেই নিয়েছে , কালির কলম এর লেখার যে তৃপ্তি সে এক স্বর্গীয় ব্যাপার। তা যাই হোক Sheaffers পেন টা নিয়ে কিছু মিছু লেখার ইচ্ছা হল। কেমন লিখছে পেনটা দেখার জন্য হাতে নিলাম।  তার তো পোয়া বারো , অনেক দিন বাদে সে হাতের উষ্ণতা অনুভব করছে , তার তো  একেবারে আহ্লাদে আটখানা হাল।  মিটি মিটি হেসে সে বললে , " আমাকে এতদিন বাদে ছুঁয়েছ , আজ সহজে হাত ছাড়া হবো না। " , আর আমারও যে বেশ ভালো লাগছিলো সেটা বলাই বাহুল্য। কলম কাগজ নিয়ে লেখার অভ্যাসে বেশ ধুলো জমেছে , তবুও আমাদের মত কিছু মানুষ আছে যাদের হাতে কলম উঠলে কাগজ , কলম আর নিজের , সবারই জন্য সেটা আনন্দের ব্যাপার হয়।  কিন্তু এর পর তো আসল বিপদের সূচনা , হাতে কলম , টেবিলে কাগজ ,হাত আঙ্গুল আর কলম  মিলে কাগজের উপর আঁকিবুকি কেটে চলেছে , কিন্তু কি লিখব ভেবেই পাচ্ছি না। এ হেন্ বিপদের মাঝেও কিন্তু মন বেশ খুশি খুশি। গতকাল এসেছিলাম দিল্লি , অফিসের কাজে। আজ কাজ মিটে গেলো তাড়াতড়ি , চলে এলাম দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন , অনেক আগেই , ট্রেন এর সময় হতে অনেক দেরি।  স্টেশন এর ওয়েটিং রুম , বেশ বড় আর খোলামেলা।  অনেক মানুষ বসে আছে , কয়েকজন নিদ্রা দেবীর আরাধনায় , দুটো বাচ্চা , ভাই বোন হয়তো , হল ঘরে দৌড়াচ্ছে। ঘরের কোনার দিকে একটা ফাঁকা চেয়ার পেয়ে গেলাম। সেখান থেকে ওয়েটিং রুম এর পুরো হলঘর দেখা যাচ্ছে , নানা রকম এর মানুষ , সেখানে বসে বেশ খানিক্ষন "মানুষ দেখা " সারলাম। কিন্তু সে আর কাঁহাতক করা যায় , কোনো সুন্দরীর চোখে চোখ পড়লেই অগ্নিবর্ষনের আশঙ্কা , কোনো বাচ্চার সাথে বন্ধুত্ব করতে গেলে তার মায়ের অপ্রকাশিত ভর্ৎসনা , তাই ভাবলাম মোবাইলে জমানো বই গুলো উল্টে পাল্টে পড়ি।  কোনো এক বন্ধু আমাকে বেশ কয়েকটা বাংলা বই এর পিডিএফ ফাইল দিয়েছিলো , এতদিন সেগুলো খুলে দেখা হয় নি।  স্ক্রল করতে করতে "ঠাকুমার ঝুলি" পেয়ে গেলাম। সে এক চূড়ান্ত আনন্দের অনুভূতি , এক লহমায় বয়েস আমার ৫০ বছর পিছিয়ে গেল , হুড়মুড় করে মনে পরে গেল  অনেক কথা , ফিরে গেলাম ফ্ল্যাশব্যাক এর গাড়ি করে। …. Garrad এর রেকর্ড চেঞ্জার এ দাদাভাই  "ঠাকুমার ঝুলি" এর LP চালিয়ে দিয়েছে , তখনকার যুগের স্টিরিও , গম গম করে বাজছে  বুদ্ধু ভুতুম এর গল্প  ,,,,, বেছে বেছে আবার পড়তে শুরু করলাম সেই গল্পটাই। এ রানী জন্ম দিয়েছে বানর ছানা , আর এক জনের গর্ভে জন্ম নিয়েছে এক  প্যাঁচা , আর আছে এদের পাঁচ সৎ ভাই , আর পাঁচজনের মত মানুষ। তারা রাজকুমার , তারা পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে , আর বুদ্ধু ভুতুম এর ভালো করে খাওয়াই জোটে না। … এক টানা অনেক খানি পড়ে ফেললাম , " কুঁচবরণ কন্যা তার মেঘবরণ চুল ,,,. " । এমন সময় সিটি বাজিয়ে বাড়ি ফেরার ট্রেন ঝমঝমিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকলো , গল্প পড়া থামিয়ে নস্টালজিয়ায় ভাসমান হয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম । …..
আজ ব্লগ এ  পোস্ট করার জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করতে হলেও আদপে লেখাটা খাতায় রয়ে গেছে। কলম এখনো আমার নিত্য সঙ্গী ( নাকি কোন তন্বী সঙ্গিনী) , ব্যাগের মধ্যে খাতাটাও থাকে , কলম এর ইচ্ছার সাথে আমার উদ্দীপনা মিলে গেলে , কিছু অনুভূতি লিপিবদ্ধ হয় ,, কলমের কাছে এটাই আমার পাওয়া। …




অভ্রজিৎ
২১শে ফেব্রূয়ারি ২০২০

Friday, February 14, 2020

গানের ছবি - 2

গানের ছবি ২ - "এসো শ্যামল সুন্দর "

অনেক দিন পর শুনছিলাম ওই গানটা , "এসো শ্যামল সুন্দর,, " বহু শ্রুত রবীন্দ্রসঙ্গীত , সব শিল্পীরাই  একবার করে রেকর্ড করেছেন মনে হয় এই গান । কিন্তু কথা সেটা না , এই গান এর সাথে আমার খুব ছোট বেলার নানা স্মৃতি জড়িয়ে। বলা যায় আত্মিক যোগাযোগ। সেই ছেলেবেলার কথা , তখন আমি মনে হয় নার্সারি স্কুলে। আমাদের বাড়ীতে একটা Garrad এর রেকর্ড চেঞ্জার ছিল , গান শোনার জন্য সবে তখন স্টিরিও সিস্টেম বাজারে এসেছে। সাউন্ড অফ মিউসিক এর ছবির গান RCA Victor কোম্পানীর LP রেকর্ড এ অরিজিনাল সাউন্ড ট্র্যাক , সে এক অসাধারণ উদ্দীপনার সময়।  তবে তার সাথে সাথে "পুরোনো প্রযুক্তি " ও সমান ভাবে বর্তমান। আমার দাদাভাই এর সংগ্রহে অনেক ৭৮ RPM এর গালার গ্রামাফোন রেকর্ড ছিল , রেকর্ড এর এপিঠ ওপিঠ মিলিয়ে দুটো গান , অথবা একটা লম্বা গান থাকতো তাতে।  এই রকম এর একটা রেকর্ড এ ছিল " এসো শ্যামল সুন্দর " , মহিলা কন্ঠে , কার গাওয়া মনে নেই, এই গানটা ছিল আমার খুব প্রিয়।  খুব ছোট ছিলাম , তাই রেকর্ড চেঞ্জার চালানোর পারমিশন ছিল না , তাই বড়ো কারুর কাছে আবদার করতে হট , গান চালিয়ে দেবার জন্য।  সে যাই হোক , এটা আসল কথা না , এই গানের সাথে একজন মানুষ কেমন ভাবে যেন জড়িয়ে গিয়েছিলেন, আর তিনি এখনো একই ভাবে ওই জায়গায় রয়ে গেছেন।  এই গানটা যখনি শুনি ওনাকে দেখতে পাই , তিনি হলেন কণিকা মিস , আমার পড়াশুনার শুরু চুঁচুড়ার পঞ্চানন তলার "চারুবাবুর স্কুল" এ , সবাই ওই নামেই জানত কণিকা মিস ওই স্কুলে নার্সরী ক্লাসে আমাদের সামলাতেন।  স্কুল মানে তো মজার জায়গা , একটু একটু লেখাপড়া , আর বাকিটা ছিল ভরপুর আনন্দ। ওই স্কুলে রোজ টিফিন এর পর নিয়ম করে ঘুমের ক্লাস হতো , শুধু নার্সারি ছাত্র ছাত্রীদের জন্য ছিল এই ব্যবস্থা।  কণিকা মিস আমাদের নিয়ে যেতেন একটা বড়ো ক্লাস ঘরে , সেখানে ছোট ছোট ডেস্ক ছিল , আর ছিল অনেক সুন্দর সুন্দর ছবির বই , আর ঘরের একপাশে ছিল একটা অর্গান। ওটা আমার কাছে খুব লোভনীয় ব্যাপার ছিল।  কণিকা মিস আমাদের ঘুম পাড়াতেন , আরতি মিস খুব ভালো অর্গান বাজাতেন ,  আজ থেকে ৫০ ৬০ বছর আগে সব বাড়িতে পিয়ানো বা অর্গান বাজানোর চল ছিল , বিশেষ করে যারা রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন তাদের কাছে এটা শিক্ষার অঙ্গ  ছিল। আমি , রাহুল , অভিজিৎ , ইন্দ্র সবাই অবাক হয়ে অর্গান এর সাথে কণিকা মিস এর গান শুনতাম , আর গান শুনতে শুনতে ডেস্ক এ মাথা রেখে নিজের অজান্তে ঘুমিয়ে পড়তাম। কেমন একটা স্বপ্নের জগৎ ছিল।  কণিকা মিস কি গান গাইতেন একটুও মনে নেই , কিন্তু " এসো শ্যামল সুন্দর " শুনলে কেন জানি না ওনার মুখটাই সব চেয়ে আগে মনে আসে, এখনো আমার মনে এই গানের সম্পূর্ণ ছবি উনি, এর কারণ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমার নেই , জ্ঞান ও নেই। ষাট এর দশক এর মাপকাঠিতে ( এই ম্যাককাঠির সংজ্ঞা এখন বুঝি , তখন ছিল শুধুই ভাললাগা) উনি তেমন সুন্দরী ছিলেন না। শ্যামলা ছিল তার গায়ের রঙ , সাধারণ features , কিন্তু উনি আমার কাছে ছিলেন ওই গানের প্রতিচ্ছবি, বলা যায় " গানের পার্সোনিফিকেশন"; রবি ঠাকুর লিখেছিলেন বর্ষার গান হিসাবে , আর সেটা হয়ে গেল আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ।  এই গানের প্রথম কলি কানে এলেই , আমার মন চলে যায় সেই সেছেলেবেলার দিন গুলোয় , কণিকা মিস এর অবাক করা স্নেহা মাখা গলার গান শুনতে পাই।  এ এক ভীষণ জ্বালা , এই মানুষ গুলো বসবাস করে আমাদের মনের কোনো এ কনের ঘরে।  কে জানে , হয়তো এ এক ভালোবাসা , এ হয়তো প্রেম এর কোন এক রূপ , আমি জানি না , শুধু এটা জানি এই গানটার ছবি আমার কাছে এখনো সেই কণিকা মিস ; সে কোন আকাশের শ্যামল সুন্দর  মেঘ , নাকি এক পশলা তপ হরা বৃষ্টি - আমি জানি না - আজীবন অজানাই থাকল নাহয় , অবুঝ মনের ঠিকানায় থাকেনা স্মৃতি হয়ে ,, ক্ষতি কি !!!....

- অভ্র