Monday, March 31, 2025

অনেকটা আফসোস থেকে গেল

বয়স বাড়লে বোধহয় নিজের সাথে বক বক করার ইচ্ছা খুব বেড়ে যায়। কারণে অকারণে অনেক পুরোনো কথা মাথায় এসে ভীড় জমায়। মজার কথা গুলো , নিজের বোকামির কথা গুলো মনে করে যেমন খুব হাসি পায় , তেমন অনেক কথা মনে করে না পারা বা না পাওয়া গুলো চোখের সামনে চলে আসে। মনে হয় একটু যদি maturity থাকত তখন, তাহলে হয়তো ব্যাপার স্যাপার গুলো একটু বেটার সামলাতে পারতাম।৪৫ বছর বয়স পার করার পর তাও একটু গায়ে গতরে লেগেছে । তার আগে তো সব জামাকাপড় মনে হতো আমি ধার করে পড়েছি , বিশেষ করে পাঞ্জাবি পড়লে তো কথাই নেই মনে হত কেউ সেটা হ্যাঙ্গার এ ঝুলিয়ে দিয়েছে। এটা অস্বীকার করা যায় না যে হলদি নদীর হাওয়া , naptha এর মধুর সুবাস ওই দশ বছরে ভালই কাজ করেছিল। সে যাই হোক নিজেকে হিরো ভাবতে কার না ভালো লাগে। মফঃস্বল থেকে বেক্কলেজে পড়তে এসে ভাবতাম আমি কি একটা হনু, তখন মাথায় এটা ছিল না যে কলেজের বাকিরা আমার থেকেও অনেক বড় বড় হনু। তুমুল ragged হয়েছিলাম, তাতে কিছুটা হনু ভাব কমেছিল। সে তো গেল কলেজের কথা , ফটোগ্রাফি আগেই করতাম , কলেজে গিয়ে গিটার বাজানো শুরু করলাম। বেশ ভালই ছিলাম কিছুদিন । বছর দশেক বাদে আবার " আমি কে একটা হনু " নামক ভূত আবার মাথায় চেপে বসল। আবার সেই এক কান্ড । মাথার মধ্যে সে স্থায়ী প্যারাসাইট হিসাবে বসবাস শুরু করে দিয়েছে ততদিনে । আবার মনের মধ্যে হিরো হিরো ভাব । তবে এবার উপসর্গগুলো অন্য রকমের ছিল। লোকজন কে সুযোগ পেলেই জ্ঞান দিতে শুরু করলাম । সাবজেক্ট যাই হক না কেন , আমি সেটা জানি , দেখলাম লোকজন শুনছে , লুকিয়ে মুখ টিপে হাসলেও , আমি তো সেসব জানতে পারছি না। ধীরে ধীরে এমন একটা ভাব হলো যে আমাকে কিছু না জিজ্ঞাসা করলেই আমার মনে হত এরা অর্বাচীন । সেই তো মাল ছড়ানোর পর আমার কাছেই আসবে । এমন ভাবত চলল বেশ অনেক দিন । আমি বুঝতেও পড়ছিলাম না যে আমার এই মনোভাব এর কারণে একজন একজন করে বন্ধু কমছে ( অবশ্য সে রকমের বন্ধু আমার কোনদিন ছিলই না ) তাও যে কজন কাছে ঘেঁষত সেই সব মানুষ গুলো একটু দূরত্ব বজায় করে চলতে শুরু করল । আমার তখন সে সব চিন্তা নেই । এর মধ্যে আবার ডাটাকোয়েস্ট ম্যাগাজিন আমাকে নিয়ে একটা আর্টিকেল প্রকাশ করে ফেলল , ফুল পেজ ছবি , তারপর আমার ইন্টারভিউ । ব্যাস আমায় আর পায় কে । কদিন বাদে একটা নেটওয়ার্কিং কোম্পানি আমাকে বিদেশ নিয়ে গেল বক বক করার জন্য । আমাকে আর পায় কে । ভাবলাম বিশ্ব জয় করে ফেলেছি । এর মধ্যে আবার কলকাতার সিনেমা জগতের  কিছু লোকজনের সাথে চেনা জানা হল , পুরনো চেনা জানা , অলি পাবের টেবিলে একটু জোরালো হল। তারই মধ্যে আবার আমার লেখা কিছু কবিতা গান নিয়ে কলকাতার একটা এফএম চ্যানেল ঘণ্টা তিনেক এর শো করে ফেলেছে। আমাকে আর পায় কে তখন ।ওই "আমি কি একটা হনু " ভূত মাথাটা পুরো নষ্ট করে দিয়েছে বাই দ্যাট টাইম। কিন্তু এই সব কি আর বেশিদিন বজায় রাখা যায়, কাজের জায়গাতে খিটিমিটি লাগতে শুরু করল । কাউকে দোষ না দিয়ে দশ বছরের পুরনো চাকরি ছেড়ে আবার চলে গেলাম হায়দ্রাবাদ । ওই কাজের জায়গাটা ঠিক জমল না চলে এলাম জয়পুর । তবে এত দিনে মাথার ভুতটা অনেক্তাই শান্ত হয়ে গেছে , আমার সাথে সাথে তারও
তো বয়স বাড়ছে বই কমছে না। তিন কুড়ি পেরিয়ে এসে মাথার ভুত এর বোধ বুদ্ধি একটু হল বলা যেতে পারে। আমি নিজেও এখন বুঝতে পারি গত ৬১ বছর ধরে কি ভয়ানক ভুল করে এসেছি। এই হনু ভুত যদি আমার মাথায় ভর না করত তাহলে হয়ত আমার জানার বা শেখার দৌড়টা আর খানিক লম্বা হত। বড্ড আফসোস হয় আজকাল , কত কিছু পড়া হল না , কত কিছু জানা হল না। পৃথিবী  জুড়ে কত শত  গুণীজন। তাও চেষ্টা করেছিলাম পড়াশুনার দু একটা কিছু শেখার , সেভাবে শেখা হল না , শখ হয়েই সেগুলো রয়ে গেল। আর কি , খুব জোড় ১৫ বছর , বা ২০, আর কিছু না পারি আর খানিক টা রবীন্দ্রনাথ এর সৃষ্টি  পড়ে ফেলতে হবে , না হলে এতদিন বেঁচে থাকা, ওই ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে সময় কাটানোর মত হয়ে যাবে, সেটা তো হতে দেওয়া  যায় না ।

Wednesday, March 12, 2025

মন বসন্ত

বসন্ত এলে মন খারাপ হয় নাকি মন ভেসে যায় এটা বুঝতে বুঝতে ৬১ টা বসন্ত পাড় করে  ৬২তম বসন্ত এসে গেল ,তবুও ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। তবে বয়েসের সাথে সাথে একটা মস্ত কনফিউশন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। জ্ঞানী লোকজন বার বার করে নানা ভাবে বলে গেছেন," বয়স কে পাত্তা দেবে না , ইটস জাস্ট আ নাম্বার,, " কিম্বা " বয়স যতই বাড়ুক মনের বয়স বাড়তে দেবে না " । এই সব কথা গুলো খুবই কনফিউজিং । ৬২ বছর বয়েসে আমি যদি বলি আমি রোজ  ১৫ তলা সিঁড়ি হেঁটে উঠব , নামব, অথবা হঠাৎ করে ক্রিকেট খেলতে নেমে ২০ ওভার বোলিং করব , সেটা বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আমার সাথে সাথে আমার  হৃদযন্ত্র, ( হৃদয় না কিন্তু) ফুসফুস, যকৃৎ, অগ্ন্যাশয় ইত্যাদি যন্ত্রপাতিগুলো সবকটাই তো বুড়ো হল। কিন্তু এদের হেড অফিস এর বড়বাবু ,মানে মগজ স্যার, তেনার হয়েছে মহা মুস্কিল, বুড়ো হয়েছে কিন্তু কিছুতেই মানবে না, এতদিন ধরে কাজ করছে , বুঝতে চায় না রেস্ট নেওয়া দরকার , মাঝে ২০২০ সালে মিনিট ১৫ জন্য পড়েছিলেন মুখ থুবড়ে , অবশ্য তারপর নিজেই উঠে পড়েছিল। থামবার পাত্র সে নয়। সাথে আছে , সব কিছু সামলানোর দ্বায়িত্ব নিয়ে , দুর করে দিতে তো পারিনা। মাথা আছে তাই ভাবতে পারি , না থাকলে ভাবের অভাব হবে তো।

যাই হোক যা বলছিলাম, আবার একটা বসন্ত এল, এখন এলেও অবশ্য  সে রকম ভাবে কিছু এলোমেলো করতে পারে না। কিন্তু কিছু তো একটা গণ্ডগোল পাকাবেই , সবাই বলে বসন্ত নাকি ফুলের রিতু, পলাশ শিমুল হাজির হয়ে পরে সব লাল করে দেয়, সেই সব দেখে লোকজন উল্লশিত হয়ে গান টান লিখে ফেলে ( আমিও বহু বছর আগে বেশ কয়েক বার এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলাম, বেশ কয়েক খানা গান লিখে ক্ষান্ত দিয়েছি)। কিন্তু তা বললে তো হবে না বসন্ত এসে গেছে ,বাড়িতে ফুলের বাগানে ফুলও ফুটেছে খানিক, তাও ছবি তোলা হয়নি । কি করা যাবে আর জানুয়ারি মাসে তোলা কয়েকটা ছবিই না হয় পোস্টালাম। অবশ্যি এতক্ষন ধরে যা যা বক বক করলাম তার সাথে কোন সংযোগই নেই ছবি গুলোর। সবাই ত দেখি ( আমিও তাদের মধ্যে পড়ি বটে) বেশ গুছিয়ে লেখে ছবির  সাথে ছন্দ মিলিয়ে , গল্প বলে । আমার মনে হল আনকানেক্টেড লেখা আর ছবি পোস্ট করি , দেখি না কেমন হয় ব্যাপার টা...

Thursday, March 6, 2025

স্মৃতি চারণ -16

কি পারি আর কি পারি না , অথবা কি পারতাম আর কি পারতাম না , তিন কুড়ি পেরিয়ে এসে একটা লিস্টি বানাতে বসেছিলাম। খুব কঠিন কাজ , প্রথমে ফর্দটা বেশ লম্বা হয়ে গেল। কিন্তু ওই যে , মাথামে পোকা গুলো সবসময় কিল বিল করতা হ্যায়, তাই মনে হল জ্বালাতনটা  করি , এক এক করে লিস্টির সব আইটেম নিয়ে আলোচনা করে অন্যের মাথাই নষ্ট করতে না পারলে কি শান্তি।

একদম ছোটবেলায় ভাবতাম না সে ভাবে কি পারি আর কি পারি না। তারপর একটু বড় হলাম , ওই ক্লাস সেভেন এইট এ পড়ার সময় , সাঁতার কাটতে পারতাম, সাইকেল চালাতে পারতাম , ছবি আঁকতে পারতাম, সাথে সাথে দাদাভাই এর পেন্ট্যাক্স এসএলআরে লম্বা টেলিফটো লেন্স লাগিয়ে ছবিও তুলতাম , আবার দরকার হলে ডার্ক রুমের কাজও করতে পারতাম, এমনকি দু চারটে ট্রানজিস্টর , ক্যাপাসিটির , রেজিস্টর সোল্ডার করে "একটা জিনিষ " বানাতেও পারতাম । আর সাথে ছিল স্কাউটিং, জ্যাকসন কাপ , স্যাটা বোস কাপ জেতা স্কাউট ট্রুপ এর সদস্য হিসাবে নিজেকে মনে করতাম আমি একটা বিশাল হনু।তাই মনে মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা কালো অজগরের মতো আস্তানা গেড়েছিল, ভাবতাম আমি অনেক কিছু পারি, তাই আমি অন্যদের থেকে এক নয় দুই নয়, বেশ কয়েক কাঠি উপরে। আমার মতো এত কিছু পারা অনেকেই পারে না। আর এই সব ভাবনা থেকে একটা ভয়ংকর "ম্যা হু হিরো" কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছিল। একটা ক্ষীণকায় ছেলে, আন্ডারওয়েট, তাই নিয়ে মোস্তানি করে চলতাম। যার ফলস্বরূপ আমার সেভাবে কোনো বন্ধু ছিল না, তখন বুঝতাম না, এখন বুঝতে পারি ওরা আমাকে কেন পছন্দ করতো না।

ক্লাস নাইনের একটা পরীক্ষায় এডিশনাল ম্যাথমেটিক্সে ১০০ এর মধ্যে ১৩ পেলাম। সেটা ছিল আমার অহংকারের গোড়ায় প্রথম ঘা। তবে ধাক্কা খেলেও সামলে যাবার মাল তো আমি ছিলাম না। সবজান্তা ভাব একটুও কমলো না। অঙ্কের মাস্টারমশাই বাড়িতে ডেকে পড়ানো শুরু করলেন, তখন বুঝলাম আমি কি প্রকৃতির গাধা। ততদিনে সিগারেট টানতে শিখে গেছি, ক্লাস টেনের শুরুর দিকে সরস্বতী পুজো, স্কুলে ক্লাস টেনের ছেলেরা পুজো সামলাতো, আমিও যোগ দিলাম ( স্মারজিতের কথা খুব মনে পড়ছে, একসাথে মিলে পুজোর আগের রাতে অনেক দুষ্টুমি করেছিলাম, ৪৭ বছর হয়ে গেছে, স্মৃতি মুছে যায়নি এক ফোঁটাও, কিন্তু স্মারজিত আর নেই, কোভিডের সময় চলে গেছে না ফেরার দেশে )। তারপরে গরমকালে জন্ডিস হলো, রোগা তো ছিলামই ,খ্যাংড়া কাঠির মতো হয়ে গেলাম। তখন সব ছেড়ে দিয়ে টেবিল টেনিস খেলতে শুরু করেছিলাম, সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। অবশেষে পড়াশোনার দিকে একটু মন হলো। অঙ্ক ভালোবেসে ফেলেছি ততদিনে। শরীর খারাপ হলে কি হবে, আমি পঙ্খীরাজ বাইসাইকেল চড়ে রাজ্য জয় করে বেড়াতাম। বয়সের ধর্মে যা হয়, বাণীমন্দিরের লাল-সাদা ইউনিফর্ম আমাদের চোখ ধাঁধানো, মাথা ঘোরানো শুরু করে দিয়েছিল। তখন একবারও মনে হতো না যে আমার চেহারা চিন্ময় রায়ের মতো, কী দুর্ভাগ্য, ওই সময় যদি একটু সুমতি হতো, হয়তো জীবনটা অন্যভাবে গড়তে পারতাম। যাইহোক, এর মধ্যে আবার ফটোগ্রাফি ক্লাব শুরু হয়েছে, আমি সব থেকে ছোট সদস্য, ১৬ বছর বয়স, বাকিরা সব দাদাভাইয়ের বয়েসী, সবাই প্রায় ২০ বছর বড়। কিন্তু তাতে কী আসে গেল, নিজেকে আমি কেউকেটা ভাবতে শুরু করেছি। চুঁচুড়া ছোট জায়গা, সবাই সবাইকে চিনতো। যেহেতু কলেজিয়েট স্কুলে পড়তাম, একটু নাম ডাক ছিল, তার সঙ্গে কী কী পারি তার তালিকা লম্বা হওয়াতে আমার ল্যাজটা ভালোই মোটা হয়ে গিয়েছিল। 

এই সব করতে করতে মাধ্যমিক, মোটামুটি ভালো রেজাল্ট হলো, এগারো-বারো পারিয়ে, জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিলাম, বি ই কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেলাম। মফঃস্বলের ছেলে, বি ই কলেজে গিয়ে অহংকার খুব বেড়ে গেল, মাথার মধ্যে সেই কালো অজগরটা ততদিনে আরও বেড়ে উঠেছে। মাথায় ছিল না যে বি ই কলেজে সবাইই আমার মতো অথবা আমার থেকে অনেক অনেক বেশি গুণী মানুষ। এইসব বোধবুদ্ধি থাকলে কি মানুষ, এইসব কাণ্ড কারখানা করে। মানুষ এর শোধরানোর সময় কলেজ আর হোস্টেল লাইফ , আমার উল্টো হলো বি ই কলেজ থেকে বেরিয়ে প্রফেশনাল লাইফ , সেই জীবনের ৪০ বছর পেরিয়ে আসার  আমার আজ এই উপলব্ধি হয়েছে , যেগুলো পারি বলে ভাবতাম সেগুলোর ব্যাপারে আমি একদম মাঝারি ধরনের। মাঝে মনে হয়েছিল লেখা লিখি পারি, এমন ভাবার যথেষ্ট কারণও আছে, বন্ধু বান্ধবরা আমার লেখা পড়ে হাততালি দিত, রেডিওতেও অনুষ্ঠান হল আমার লেখা নিয়ে , আমি আবার ভাবতে লাগলাম আমি বিরাট কিছু করে ফেলেছি। দু একটা রেকর্ডিং আর অনুষ্ঠানে বাজিয়ে নিজেকে বিশাল গীটারিস্ট ভাবতাম , গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ছবি তুলে নিজের কাজে নিজেই বাহবা দিতাম । কিন্তু এই তিন কুড়ি পেরিয়ে এসে বুঝলাম আমি আসলে কিছুই পারিনা । এগুলো সব ভরং, আসল জায়গায় হিসাবের খাতায় সব লোক দেখানো হিসাব। আসল পারা যেটা সেটা হলো মানুষকে হ্যাপি করা , আমার আশেপাশে যারা থাকে তারা কেউই খুশি না । নিজের মধ্যে উঁকি মেরে দেখলাম আমি নিজেই একটা empty bottle and a broken song ,, নিজেও খুশি মানুষ নয়। এমন অখুশি জীবন আরো কতদিন টানতে হবে কে জানে।