বেশ কদিন ধরেই ভাবছি কি লিখি কি লিখি। বহুদিন হল সে রকম গপ্পো সপ্পো পোস্ট করা হয় নি। কেন হয় নি , সে সব নিয়ে পরে কোন একদিন কথা বলা যাবে। আজ একটা রিসেন্ট অভিজ্ঞতার কথা বলি।
প্রায় বছর দুয়েক হল নিয়মিত কাজের জায়গা থেকে রিটায়ার করেছি। দীর্ঘ আটত্রিশ বছরের টেকনোক্র্যাট এর জীবন কাটানোর পর কি চুপ করে বসে থাকা সম্ভব নাকি। তাছাড়া আধা সরকারি , বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেছি সারা জীবন , তাই বসে বসে পেনসন উপভোগ করারও উপায় নেই। বি ই কলেজ থেকে পাস করেছিলাম সেই গত শতাব্দীর শেষের দিকে, বিষয় ছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। পাস করার পর প্রথম কয়েক বছর ওই সব নিয়ে কাজ করেছিলাম । তারপর পাকাপাকি ভাবে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শিকেয় তুলে ইনফর্মেশন টেকনোলজির সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিলাম ১৯৮৯ সালের মাঝামাঝি। তারপর নানা ঘাটের নানা স্বাদের জলগ্রহণপূর্বক শেষ পর্বে একটা ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং সংস্থার সিআইও হিসেবে রিটায়ার করলাম। কিন্তু যে কথাটা বলছিলাম , আমি মানুষটা তো থেমে যাবার মানুষ না, ওই সংস্থার সাথেই কনসালটেন্ট হিসেবে আবার কাজ শুরু করলাম। তবে এবারে কাজের এলাকাটা একটু আলাদা। তথ্য প্রযুক্তি ছেড়ে যে মানুষজন কাজ করে ওখানে তাদের পেশাগত , মানসিক উন্নতির দায়িত্ব পেলাম । আমার বেশ ডগমগ ভাব। এমনিতেই মানুষজনের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে, এখন সেটা নিজের মতো করে করতে পারব। নতুন অধ্যায় খুশি মনে গত দেড় বছরে অনেক কিছু করে ফেলে নিজের achievement আমি নিজেই বেজায় খুশি। এই সংস্থার অনেক জায়গাতে অফিস , প্ল্যান্ট, দেশের নানা প্রান্তে প্রজেক্ট চলছে। তাই অনলাইন ট্রেনিং এর সাথে হাতে হাতে ওয়ার্কশপ করাতে যেতে হয় বিভিন্ন শহরে। বেশি না হলেও মাসে দু মাসে একবার ট্রাভেল থাকেই। গত ঊনিশ তারিখ সেই রকমই তিন দিন এর একটা ট্রেনিং প্রোগ্রাম এর ফ্যাকাল্টি হয়ে হরিদ্বার এর পথে পারি দিয়েছিলাম। প্রতিবারই বিকালের এই ফ্লাইটটাই নিয়ে থাকি। দিনের বেলা কাজ সেরে বিকেল বেলা উড়ে পৌঁছে যাওয়া। সব কিছু সামলে নিয়ে পরদিন থেকে কাজ শুরু করা। সেদিন ও সেই রকমই ব্যবস্থা। এয়ারপোর্ট পৌঁছে দেখলাম ফ্লাইট delayed। অগত্যা দু ঘণ্টা লাউঞ্জে কাটিয়ে বোর্ডিং এর লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনে একটু বিরক্তি এক ঘন্টার ফ্লাইটে এক ঘন্টা delay। কার ভাল লাগে। সে যাই হোক প্লেন তো উড়ল, অনেক সময় নস্ট করার পর। কানে ইয়ারফোন গুঁজে গান শোনার চেষ্টা ইঞ্জিন এর আওয়াজের ঠ্যালায় প্রায় বৃথা । কারণ আমার সিট টা ছিল 18F । ATR-72 Aircraft, তাই ইঞ্জিনের ঠিক পেছনেই আমার সিট, এমনিতেই টার্বো প্রপ ইঞ্জিন খুব আওয়াজ করে। গান প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না। বিরক্ত হয়ে গান বন্ধ করে মোবাইল ফোন জমানো টিনটিন পড়তে শুরু করলাম। একটু ঝিমুনিও আসছিল না যে তাও না। এক ঘন্টার ফ্লাইটে ঘুমোনোর তোড়জোড় করতে করতেই নামার সময় হয়ে যায় , তাই সে চেষ্টা না করে অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে চিন্তায় ডুব দিলাম। মাঝে মধ্যে পাশের সহ যাত্রীর সাথে কথা হচ্ছিল , তবে গভীর কিছু না। অন্ধকারে অন্ধকার খোঁজার মাঝে হঠাৎ একটা আলোর ঝলক দেখলাম, অনেকটা কালি পটকা ফাটার মত আলো , একটু কমলা হলদে মত। ওটা যে ইঞ্জিন ফায়ার সেটা বুঝতে পারেনি। হঠাৎ স্টারবোর্ড সাইডের ডানার নিচে একটা আলো জ্বলে উঠল, সেই আলোতে দেখলাম যে স্টারবোর্ড সাইডের ইঞ্জিনটা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমার এক বদ অভ্যাস আছে, চিরকালই নানা বিষয়ে ইন্টারেস্ট, তাই যখন যেখানে যা জ্ঞান পাই কুড়িয়ে বাড়িয়ে নিয়ে মাথায় ঠুসে নি। ছোটবেলা থেকেই সেই জন্য নানা রকমের বিদ্রুপ শুনতে হয়েছে , কখনো বৈজ্ঞানিক, কখনো পাকা। তাতে অবশ্য কিছু এসে যেত না। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এরোপ্লেন, aerospace engineering, aeronautics, ইত্যাদি বিষয়ে একটু বেশিই ভালো লাগা আছে আমার। তাই আসন্ন বিপদের আশঙ্কা আমাকে কিছুক্ষণের জন্য একটু বিহ্বল করে দিয়েছিল। কিন্তু মুশকিলটা হল যে প্লেনের মধ্যে এই বিপদের কথাটা কাউকে বলা যাবে না। ল্যান্ডিং এর তখন আর ২৫ মিনিট মত বাকি। প্লেন টা তখন এক পায়ে মানে এক ইঞ্জিন এর ভরসায় উড়ছে ,, মানে পোর্ট সাইড এর ইঞ্জিন সমস্ত পাওয়ার দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে। ভাবলাম এ আর কি এমন, এই ভাবেই না হয় নেমে পড়বে দেরাদুন এয়ারপোর্টে। জ্ঞান তো তাই বলছে , সমস্ত এয়ারক্রাফট নাকি একটা ইঞ্জিন এর ক্ষমতায় উড়তে পারে শুধু ল্যান্ডিং এর সময় একটু সাবধানে মানুভের করতে হয় । কিন্তু সে তো হবার না। ক্যাপ্টেন খুব চিন্তিত গলায় ঘোষণা করল যে এক দম ঘাবড়াবেন না , আমাদের বিমানে একটা ছোট টেকনিক্যাল প্রবলেম হয়েছে , তাই আমরা দিল্লী এয়ারপোর্টে এমারজেন্সী ল্যান্ডিং করব। আপনারা আমাদের সাথে সহযোগিতা করুন। সব ঠিক থাকলে আমরা ২৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে দিল্লীতে পৌঁছে যাব। এই "সব ঠিক থাকলে" কথাটা শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে গেল ( যাকে বলে চিল ইন দ্যা স্পাইন ) । এই ঘোষণা শুনে সবার মনে প্রশ্ন কি হল আবার , কেন দিল্লী যাবে । ততক্ষনে এমারজেন্সী প্রসিডিওর ট্রিগার হয়ে গেছে। কেবিন ক্রু দের ডেকে ক্যাপ্টেন ইনস্ট্রাকশন দিল। ওরা এসে আমাদের সিট বেল্ট কষে বেঁধে নিয়ে ব্রেসিং পজিশনে বসিয়ে দিল। তখন বুঝলাম যে গণ্ডগোলটা ভালই পাকিয়েছে। একটা ইঞ্জিনে এর ভরসায় ওড়া এরোপ্লেনের touchdown করার সময় নানা রকম অঘটন ঘটার সম্ভাবনা থাকে , কারন হল asymetric thrust। ঠিক মত সামলাতে না পারলে পুরো এয়ারক্রাফট রানওয়ে স্ট্রিপ থেকে পিছলে বাইরে নেমে যাবার ভয় থেকেই যায় । আর তাতে এয়ারক্রাফট ভেঙে যেতে পারে, তার উপর আগুন লেগে যাবার প্রভূত সম্ভাবনা। মুশকিলটা হলো এই সব চিন্তা মাথার মধ্যে কিলবিল করছে, কাউকে বলতেও পারছি না , তাতে তো সহ যাত্রীরা ভীষণ ভয় পেয়ে যাবে। কেবিন ক্রু মেয়ে দুটো , কতই না বয়স , টেনশনে মুখ লাল , চোখ ছল ছল। ওদের দিকে তাকিয়ে শুকনো হাসি ছাড়া কিছুই আর বলার ছিল না । এই রকম প্রায় চলল ৩০ মিনিট। ল্যান্ডিং গিয়ার এনগেজিং আওয়াজ পেয়ে আমি মাথা তুলে দেখল্যাম্ব নিচে দিল্লী শহরের আলো। প্লেন দ্রুত নিচে নামছে রানওয়ের টাচ ডাউন টার্গেট মার্ক লক্ষ করে। আবার ব্রেসিং পজিশনে মাথা নিচু করে বসতেই প্লেনটা মাটি ছুঁল। হু হু করে ডান দিকে চলে যেতে যেতে কোন মতে সোজা হল। রানওয়ের দু ধারে অনেক গাড়ি, অনেক গুলো ফায়ার টেন্ডার , ফলো আপ ভ্যান , কয়েকটা অ্যাম্বুলেন্স । সব কটা আমাদের প্লেন এর সাথে সাথে দৌড়াচ্ছে যেমনটা সিনেমায় দেখেছি। তারপর রানওয়ের ওই প্রান্তে গিয়ে প্লেন থামলে সবাই হৈ হৈ করে হাততালি দিয়ে উঠল। ৭০ জন যাত্রী আর ক্রু মেম্বাররা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
জানি না অন্যদের কি মনের অবস্থা ছিল ওই তিরিশ মিনিট ধরে, আমার মাথা থেকে প্রথম তিন চার মিনিটের মধ্যেই দুশ্চিন্তাটা উড়ে গিয়ে মাথাটা একদম ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। Helpless শব্দের আক্ষরিক মানে কি, এই রকম পরিস্থিতি না হলে সেভাবে বোঝা হত না হয়ত।
No comments:
Post a Comment