Saturday, August 12, 2023

স্মৃতিচারণ ৭ - নিমপীঠ এর কথা

সাল টা ১৯৮৬-৮৭। তখন আমি সদ্য পাস করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার , কাজ করি কুম্ভাণী কনসালট্যান্ট এ। পিনাকীদার আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ,আর দত্তদার মেন্টরিং একটা shell structure ডিজাইন করে ফেলেছিলাম , বারোটা two hinged concrete arch আর salvadori shell এর সমন্নয়ে একটা গোল মত অডিটোরিয়াম । কিন্তু সেটা তো বানাতে হবে , যে ঠিকাদার কাজ করছিল সে ফাউন্ডেশন আর প্লিন্ত্থ বিম বানিয়ে চম্পট দিয়েছে । কুম্ভাণী সাহেব এর মাথায় হাত। দু একদিন বাদে দেখলাম দুজন গেরুয়া পরিহিত সন্ন্যাসী এসেছেন , ওনার সাথে অনেক আলোচনা হল। তারপর একদিন কুম্ভানী সাহেব ডেকে বললেন নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম এ যেতে হবে , ওদের অডিটোরিয়াম বানানোর লোক নেই। এর আগে ওই রকম জায়গায় থাকিনি তার উপর ওটা সুন্দরবন এলাকা । আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা ,,আশ্রম এর স্কুল আর কয়েকটা রিসার্চ সেন্টার ছাড়া কিছুই ছিলনা । আমার আর সুব্রতর ঠাঁই হল আশ্রমের গেস্ট হাউসে। দোতলার ঘর , রাতে মশারী টাঙানো must, না হলেই পোকামাকড় আক্রমন করতে পারে। প্রথম রাতের পরের দিন ঘুম ভাঙলো ভোরের প্রার্থনা সঙ্গীতের শব্দে। অদ্ভুত পরিবেশ । এক মহারাজ একটু পরে এসে বলে গেলেন আশ্রমের ভেতরেই আমাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। শুরু হয়ে গেলে মহারাজদের আপ্যায়ন। ওনারা সন্ন্যাসী মানুষ , শ্রদ্ধেয় , কিন্তু কি অপরিসীম ভালবাসায় আমাদের যত্ন নিতেন , ভালো লেগে গেল জায়গাটা। খুব মন দিয়ে কাজ কম্ম শুরু করে দিলাম। তাছাড়া উপায় ও ছিলনা। কাজ না করলে সময় কাটানো খুব কঠিন হয়ে যেত আমার পক্ষে , যদিও গিটার টা সাথে ছিল , তাও। সে যাই হোক লোকাল মিস্ত্রি জসীমউদ্দীন তার দলবল নিয়ে কাজে লেগে পড়ল। ওদের জন্য structure এর geometry টা বেশ কঠিন ছিল , two hinged parabolic arch, salvadori shell এ সব ব্যাপার ওই সুন্দরবনের মিস্ত্রি জীবনে শোনে নি। Construction site এর ঠিক পাশেই একটা খালি মাঠ ছিল সেই মাঠ সমান করে নিয়ে shuttering এর টেমপ্লেট, staging এর পাইপ এর মাপ করে কাটাকাটি ইত্যাদি শুরু হল । দেখতে দেখতে প্রথম কাস্টিং এর দিন ও এসে গেল ,, সে কি অসম্ভব উত্তেজনা । যেন এক বিশাল মহাযজ্ঞ। কাস্টিং শুরু হলে থামা যাবে না , আর সবটাই ম্যানুয়াল কাজ । স্বামীজী, মহারাজরা মাঝে মাঝে এসে আশীর্বাদ উৎসাহ এক সাথে দিয়ে যেতেন। মাসে একটা করে সেগমেন্ট কাস্ট করা হত একি shuttering form আর staging ব্যবহার করে । এক বছরের অধ্যাবসায় আর সবার উৎসাহে কাজ শেষ হল। তৈরী হল নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রমের ইন্দিরা গান্ধী অডিটোরিয়াম।

এই গল্পটা শোনানোর জন্য কিন্তু এই সব কথা বলছি না । আমার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এর সহপাঠীদের অনেকে এর থেকে অনেক অনেক বড় কাজ করেছে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। আমি আসলে একটা নস্টালজিয়ার কথা বলার জন্য এই সব ভূমিকা করলাম । এবছর জুন মাসের ৭ তারিখ গিয়েছিলাম নিমপীঠ, রাস্তা উন্নত হয়েছে ভীড় বেড়েছে ,কিন্তু ওখানে পৌঁছে দেখলাম সব কিছু কেমন যেন এক রকম রয়ে গেছে । নতুন বিল্ডিং হয়েছে আশ্রমের আসে পাশে, লোক জন বদলে গেছে । বদলায়নি শুধু অনুভূতি , বদলায়নি ওনাদের স্নেহ ভালবাসা। মেরামতি চলছিল , তাও নিজের হাতে গড়া ওই কাজ একবার হাতে ছুঁয়ে এলাম। মহারাজ , কর্মচারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যেন আমাদের আদর যত্নে কোনো ত্রুটি না হয়। অনেক সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছিলাম । তাই গেস্ট হাউসের একটা ঘর তাড়া হুরো করে খুলে দিলেন ওখানকার অফিসের ভদ্রলোক । বললেন " বিশ্রাম করুন , আমি জলখাবার এর ব্যবস্থা করি " । শুরু হল আপ্যায়ন । Breakfast করে চারিদিকে একটু চরতে বেরোলাম । খুব গরম ছিল সেদিন । তাই খানিক বাদেই আবার ac ঘরে ফিরে এলাম । শুয়ে শুয়ে জানলা দিয়ে বাইরে গাছ পালা দেখছিলাম ,, আর ওই দিন গুলোর কথা খুব মনে পড়ছিল । এরপর ডাক পড়ল লাঞ্চ করার । আশ্রমের মধ্যে না , ওনারা ব্যবস্থা করেছেন রিসার্চ সেন্টার এর হলে। গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড । বসার জায়গা সাদা পর্দা দিয়ে ঘেরা , মাঝে ডাইনিং টেবিল, টেবিল ক্লথ বিছানো । খুব লজ্জায় পড়ে গেলাম । এলাহি ব্যবস্থা , বিয়ে বাড়ীর ভোজ এর মত। মহারাজ নিজে দাড়িয়ে থেকে খাওয়ালেন । খাওয়া দাওয়ার পর অনেক গল্প হল সবার সাথে । এরপর বাড়ি ফেরার পালা । ৩৫ বছর আগের সেই স্নেহ , সেই ভালবাসা , সেই একই অনুভূতির আবেশ নিয়ে কলকাতার দিকে পাড়ি জমালাম।।

- অভ্রাজিত 



1 comment:

  1. মহারাজদের স্নেহের পরশ অনেকবার পেয়েছি ৷নিমপীঠ কখনো যাওয়া হয়নি যাবার ইচ্ছে রইল।

    ReplyDelete