Monday, May 9, 2022

রবীন্দ্রজয়ন্তী আর কিছু স্মৃতি

বাঙালি মানেই তার কাছে ২৫শে বৈশাখ একটা বেশ বড় উৎসব ,, অন্তত আমাদের বয়সের সবাই এই কথাটা হয়তো মেনে নেবেন। মুশকিল হল আমরা যারা কর্মসূত্রে বাংলার মাটির থেকে বেশ অনেক দূরে থাকি ,তাদের হয়ত আনুষ্ঠানিক ভাবে রবীন্দ্র যাপন করা হয়ে ওঠে না , তাই মনের মধ্যেই রবীন্দ্রজয়ন্তী এর অনুষ্ঠান ঘটা করে করি। এর মধ্যে আমার কিছু গুণী বন্ধু আছেন যাদের কারনে আমার এই দিনটা বেশ একটা ভেসে ওঠার দিন , বেঁচে থাকার দিন হয়ে ওঠে। গতকাল এক বন্ধু একটা গান সুন্দর যন্ত্রানুসঙ্গ এর সাথে গেয়ে পাঠালো ,, আজ দিন শুরু হল ওই গানটা শুনে , আমার ভীষন প্রিয় একটা গান ,, 

" আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই,,,",, 

গানটা শুনতে শুনতে ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল খুব। আমাদের বাড়িতে বেশ ভাল রকমের রবীন্দ্রচর্চা করা হত। আমার বড় দাদা খুব ভাল রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইত। আমদের বাড়িতে গানের স্কুল হত , কলকাতা থেকে মাস্টার মশাই (শ্রী সমরেশ চৌধুরী ) আসতেন। তাই আমার বেড়ে ওঠা রবীন্দ্র সঙ্গীতের সাথে সাথে। স্বাভবিকভাবেই পঁচিশে বৈশাখ আমার কাছে হয়ে উঠেছিল একটা বিশেষ দিন। আমাদের বাইরের ঘরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা বড় সর ছবি ছিল, বাবার কালেকশন। সেটা দেয়াল থেকে নামিয়ে একটা চেয়ারে চাদর ঢাকা দিয়ে ছবিটাকে রাখতাম , খুব মন দিয়ে ফুল আর ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হলে ,, কয়েকটা ধুপ লাগিয়ে খানিক ক্ষণ সামনে বসে থাকতাম, কতই বা বয়স দশ কি এগারো , আর এই কাজে আমার সঙ্গী হত আমার দুই ভাইঝি বড় আর ছোট। আমি ছোট বেলা থেকেই একটু নাস্তিক ছিলাম  , কোন রকম ঠাকুর পুজো ইত্যাদী তে আমার মন ছিল না , কিন্তু বছরের এই দিনটায় আমি কেন যে ওনার ছবি নামিয়ে , সেটা সাজিয়ে ওনাকে প্রনাম জানতাম , এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। 
 বড় হবার পর যখন একটু গিটার বাজাতে শিখলাম, তখন দাদাভাই এর সাথে নানা জায়গায় এই দিনটায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতাম ,, ওটাই ছিল সেই সময়ের আমার কবি প্রনাম , আরো একটু বয়স হল , বাংলার মাটি ছেড়ে দক্ষিণের দিকে বাসা বাঁধলাম , ওখানে বদলে গেল কবি প্রনাম এর রীতি । শুরু হল গঙ্গা জলে গঙ্গা পূজা । সারাদিন গান শোনা , আমার মেয়ে খুব ছোট তখন , সে তখনও দাড়ি বুড়োকে চেনে না , গানগুলো শুনে বলত "ঠাকুরের গান" কি অদ্ভুত যোগাযোগ। বেশ কিছু বছর এভাবে চলল, তারপর ফিরলাম বাংলায় , নতুন উৎসাহে শুরু হলো রবি পুজো ,, সঙ্গী পেয়ে গেলাম কয়েকজন, দল করে গান , নাচের তালে তালে , চলল রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন, বছর বছর । 

শরীর এর সাথে সাথে মনের বয়স ও তো বাড়ে , নতুন করে চিনতে বুঝতে শুরু করলাম আমার একমাত্র ঠাকুর রবি ঠাকুর কে। গীতবিতান হয়ে উঠল নিত্য সঙ্গী , সুখ দুঃখের সাথী। গান কোনদিনই গাইতে পারি না, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার নিজের উপর অসম্ভব অভিমান। কিন্তু মন তো মাঝে গেয়ে ওঠে নিজের মত করে । তখন আরো বেশি করে বুঝি আমার অস্তিত্বে ওই সাদা দাড়িওয়ালা মানুষটা কি ভীষনভাবে আস্টে পৃষ্টে জড়িয়ে আছে। 

সারাদিন কাজের মাঝে মাঝে সেই ছোটবেলার এই দিন গুলোর কথা মনে পড়ছে ,, আর বার বার ফিরে যাচ্ছি ওই গুলোয় স্মৃতির ভেলায় ভেসে।

আজ আমার রবি পুজোয় আমার প্রার্থনা 
" .. দাও হে হৃদয় ভরে দাও
তরঙ্গ উঠে উঠলিয়া সুধাসাগরে,
সুধারসে মাতোয়ারা করে দাও।।.. "

অভ্র
২৫শে বৈশাখ ১৪২৯

No comments:

Post a Comment