Saturday, November 27, 2021

কসবার এক অচেনা চা ওয়ালা

মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঘটনা , বেশ নাড়া দিয়ে যায়। আসলে কি হয় মানুষজনের বাইরেটা একবার দেখে চেনা বা বোঝা খুব মুশকিল, আই আমাদের মত so called judgmental মানুষ , যাদের চুল পেকে সাদা , বা চুল উঠে গড়ের মাঠ , তাদের পক্ষে তো আরোই কঠিন। এমনই এক অভিজ্ঞতা হল আমার এবার। 


কলকাতা এলে চেষ্টা করি একবার সমর্পণ এর সাথে দেখা করতে । ও আমার বন্ধু আর ছোট ভাই। আর সাথে সাথে ও খুব ভালো গিটারিস্ট,, ওর সাথে দেখা করি ওর গিটার এর শো রুম এ,, নানা রকমের গিটার নাড়াচাড়া করা, গপ্পো করা , সাথে একটু jam করা ,, এই লোভটা সামলাতে পারি না । তাই এবার ও সারাদিন এর কাজ মেটার পর পৌঁছে গেলাম সমর্পণ এর গিটার এর  দ্বিতীয় দোকানে । মহা আনন্দের rendezvous । আড্ডা গল্প , গিটার , পিয়ানো এসব নিয়ে বেশ কাটলো খানিক সময় ।
,, এমন কি আর ব্যাপার , এরকম তো হতেই পারে এই সব বলার জন্য এত ভনিতা করিনি ,গল্প এখানে শেষ নয়,,

আড্ডা গিটার এর বাইরে ফুটপাতে এসে দাঁড়ালাম , দু একটা কথা , একজন কমলা টি শার্ট পড়া মানুষ উদয় হলো,, হাতে একটা রেশন ব্যাগ , তার মধ্যে একটা বড় থার্মোস ফ্লাস্ক , কয়েকটা কৌট, কাগজের কাপ ,, ওনাকে দেখে সমর্পণ জিজ্ঞাসা করল " কি দাদা , কেমন আছেন ? সব  ভালো ? ,উনি উত্তর দিলেন " সব ভাল, তোমার বৌদি ও বেশ রিকভার করেছে , আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে " । আমার খুব কৌতূহল হল , একজন অচেনা মানুষ , তাকে তো দুম করে প্রশ্ন করাও যায় না ,, উনি আমার সঙ্কোচ দূর করে বললেন ," আর বলবেন না দাদা , পুজোর সময় এবার আপনার  বৌদির হঠাৎ প্যারালাইসিস হয়ে গেল একটা দিক , ডাক্তার দেখিয়ে , ট্রিটমেন্ট করিয়ে অনেকটা সামলেছে । আমার সন্দেহ দানা বাঁধছে তখন , একটা সামান্য চা ওয়ালা তো এভাবে কথা বলার কথা নয় । তখনই খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা লোকটা এক গাল হেসে উত্তর দিলেন , " একটা করে লিকার চা দি " , আমি ভাবছি কেমন হবে , চা এর ব্যাপারে আমি বেশ একটু খুঁত খুঁতে, উনি সেটা বুঝতে পেরে বললেন " এক কাপ খেয়েই দেখুন না , আপনি আপনার দার্জিলিং চা এর ফ্লেভারটা পাবেন ",। আমি অবাক হয়ে ভাবছি উনি কি করে বুঝলেন , তারপর দার্জিলিং চা নিয়ে গল্প শুরু করলেন , হ্যান্ড রোলড , সান ড্রায়েড ,, অরেঞ্জ পিকো, অটাম ফ্লাশ ,, কসবার ফুটপাথের একজন সাধারণ চা ওয়ালা , যে দোকানে দোকানে মালিক কর্মচারীদের চা খাইয়ে রোজগার করে তার এত জ্ঞান কি করে !! জটায়ুর ভাষায় মনে মনে বললাম " আপনাকে কালটিভেট করতে হচ্ছে মশাই ,,"।  নানা কথায় আলাপ জমল । আমার বাসস্থানের কথা শুনে উনি দেখলাম খুব উৎসাহিত হয়ে পড়লেন । বললেন উনি নাকি কোটায় কাজ করার সময় জয়পুর এ অনেক বার এসেছেন । এই কথোপকথন এর সময় লক্ষ্য করলাম ওনার চোখ গুলো বেশ চকচক করছে , এমনটাই হয় যখন কেউ তার ভাল অভিজ্ঞতা এর কথা মনে করে কিছু বলে।  আমার তো কৌতুহল তখন চরমে ।  নিজেকে আর চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞাসা করেই বসলাম, " ওখানে কিসের কাজ করতেন " , উত্তরে বললেন " ওই রেলের কাজ " । ভারতীয় রেলে নানা রকমের কাজ হয় , আমি জানি । ভাবলাম হয়ত আমি কোন ঠিকাদারের সাথে কাজ করতেন , কি এমন হবে আর । আমার অবাক হবার পালা তখনো শেষ হয়নি , উনি বলে চলেছেন " কাজ গুলো বেশ জটিল ছিল, জানেন ,, " , " আসলে alcatel এর সিগন্যালিং সিস্টেম ইনস্টল করতাম তো , খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার গুলো " উনি স্মৃতির সমুদ্র মন্থন করে চলেছেন ,বলেলেন "দাদা আপনি তো টেকনিক্যাল মানুষ , নিশ্চয় জানেন alcatel এর সিস্টেম কত  advanced , এখনো ওদের টেকনোলজি কে কেউ টেক্কা দিতে পারেনি" রেল এর রুট রিলে , সিগনাল ইন্টারলকিং ওদের বেস্ট,, কলকাতা মেট্রোতেও তো ওদের সিস্টেম লাগিয়েছি । "

হাতে চা এর কাপ শেষ হয়েগেছে কখন , তবুও ফাঁকা কাগজের কাপ হাতে ধরে , হতভম্ব আমি সেটাও ফেলে দিতে ভুলে গেছি । মাথায় একটাই আমার তখন একটাই প্রশ্ন ,, কি এমন হল যে ওনাকে ওই কাজ ছেড়ে দিয়ে এসে ফুটপাথে চা বিলি করে জীবন চালাতে হয়।

সমর্পণ আমায় জিজ্ঞাসা করল " কি এত ভাবছ বলতো ? " ওর কথায় হুঁশ ফিরল , এরই মধ্যে উনি সমর্পণ এর থেকে চা এর দাম নিয়ে চলে গেছেন। আমি বুঝতে পারলাম,  আমার একটা মস্ত ভুল হয়ে গেছে , ওনার নামটাই আমি জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছি। এমন একটা মানুষ অনামি হয়ে রয়ে গেল ,,

- অভ্ৰ
২৭শে নভেম্বর ২০২১
ফ্লাইট 6E 114

Sunday, November 7, 2021

মরু ভ্রমন - ১



আট বছর হয়ে গেল এই মরু প্রদেশে ,, ছোটবেলা থেকে একটা ধারণা ছিল রাজস্থান মানেই চারদিকে শুধু বালি আর বালি , আর সেই ধু ধু মরু প্রান্তরের মাঝে একটা একটা কেল্লা ,, আর তার চারপাশে জনবসতি। এমনই একটা ছবি মাথার মধ্যে আঁকা হয়ে ছিল ,, এর জন্য দায়ী বাংলা সাহিত্য , বাংলা সিনেমা , নানা লোকের মুখে শোনা গল্প। তারপর ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাজ নিয়ে এলাম জয়পুর ,, যা দেখলাম একদমই তা সেই ছবির সাথে মেলে না ,, সুন্দর সাজানো শহর , সবুজ এর কিছু কমতি নেই। একটু মনখারাপ হয়ে গেল ,, যা হয় স্বপ্ন ভঙ্গ হলে । তারপর থেকে কয়েক বার নিজের গাড়ি নিয়ে , বা দল করে এই বিশাল রাজ্যের নানা প্রান্তে ঘুরেছি , কখনো দক্ষিণ এর দিকে ,, কখনো শেখাওয়াটি অঞ্চলে , কখনো বা পশ্চিম দিকে জয়সালমের প্রান্তে । কিন্তু সেভাবে মরুভূমি দেখা হয়নি ,, কোনবারই। তাই এবার ঠিক করেছিলাম সোনার কেল্লা ঘুরে ফেরার আগে সাধ মেটাব। হয়েও গেলে সুযোগ ,  লঙেওয়ালা এর রণভূমি দেখে চলে গেলাম দেশের পশ্চিম প্রান্তে, সীমারেখার কাছাকাছি । বেশ একটা থ্রিলিং অনুভূতি। আমাদের সাথে ছিল দুজন জিওলজিস্ট , তাদের এই অঞ্চলে অঢেল অভিজ্ঞতা, কম বয়সী সঞ্জয় বলল " চলো অভ্ৰ দা , তোমাকে একটা মরুভূমির গ্রাম দেখাই,, " , পরম উৎসাহের সাথে নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে , প্রায় তখন দুপুর দেড়টা , সূর্য্য মাথার উপর । কিন্তু তাতে কি এসে গেল । দু একটা বালিয়াড়ি , তার পাশে একটা গ্রাম , নাম রানাও বা রানাউ । গ্রাম এর চারিদিকে শুধু বালি আর বালি ,, সবুজ এর লেশ মাত্র নেই। আর গ্রামের পাশ ঘেঁষে চলে গেছে কালো হাইওয়ে । আমি শুধু ভাবছিলাম , আমাদের মত শহুরে মানুষদের এখানে কদিন থাকতে হলে কি যে হাল হত। শুনলাম শীতের সময় শূন্যের নিচে তাপমাত্রা চলে যায় আর গ্রীস্মে ৫0℃ এর আসেপাশে পারদ ওঠানামা করে । পানীয় জল সপ্তাহে নাকি একদিন পাওয়া যায় , জমিয়ে রাখতে হয় , সারা সপ্তাহের রসদ। সময় বেশী ছিলনা হাতে, এই সব নানা ভাবনা মাথায় তখন , তাই কয়েকটা ছবি বন্দী করে নিলাম আমার মোবাইলে আর ক্যামেরায় আর কয়েকটা অস্থায়ী পায়ের ছাপ মরুভূমির উপর ছেড়ে রেখে উঠে পড়লাম গাড়িতে ।

অভ্র
৭ই নভেম্বর ২০২১