মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঘটনা , বেশ নাড়া দিয়ে যায়। আসলে কি হয় মানুষজনের বাইরেটা একবার দেখে চেনা বা বোঝা খুব মুশকিল, আই আমাদের মত so called judgmental মানুষ , যাদের চুল পেকে সাদা , বা চুল উঠে গড়ের মাঠ , তাদের পক্ষে তো আরোই কঠিন। এমনই এক অভিজ্ঞতা হল আমার এবার।
কলকাতা এলে চেষ্টা করি একবার সমর্পণ এর সাথে দেখা করতে । ও আমার বন্ধু আর ছোট ভাই। আর সাথে সাথে ও খুব ভালো গিটারিস্ট,, ওর সাথে দেখা করি ওর গিটার এর শো রুম এ,, নানা রকমের গিটার নাড়াচাড়া করা, গপ্পো করা , সাথে একটু jam করা ,, এই লোভটা সামলাতে পারি না । তাই এবার ও সারাদিন এর কাজ মেটার পর পৌঁছে গেলাম সমর্পণ এর গিটার এর দ্বিতীয় দোকানে । মহা আনন্দের rendezvous । আড্ডা গল্প , গিটার , পিয়ানো এসব নিয়ে বেশ কাটলো খানিক সময় ।
,, এমন কি আর ব্যাপার , এরকম তো হতেই পারে এই সব বলার জন্য এত ভনিতা করিনি ,গল্প এখানে শেষ নয়,,
আড্ডা গিটার এর বাইরে ফুটপাতে এসে দাঁড়ালাম , দু একটা কথা , একজন কমলা টি শার্ট পড়া মানুষ উদয় হলো,, হাতে একটা রেশন ব্যাগ , তার মধ্যে একটা বড় থার্মোস ফ্লাস্ক , কয়েকটা কৌট, কাগজের কাপ ,, ওনাকে দেখে সমর্পণ জিজ্ঞাসা করল " কি দাদা , কেমন আছেন ? সব ভালো ? ,উনি উত্তর দিলেন " সব ভাল, তোমার বৌদি ও বেশ রিকভার করেছে , আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে " । আমার খুব কৌতূহল হল , একজন অচেনা মানুষ , তাকে তো দুম করে প্রশ্ন করাও যায় না ,, উনি আমার সঙ্কোচ দূর করে বললেন ," আর বলবেন না দাদা , পুজোর সময় এবার আপনার বৌদির হঠাৎ প্যারালাইসিস হয়ে গেল একটা দিক , ডাক্তার দেখিয়ে , ট্রিটমেন্ট করিয়ে অনেকটা সামলেছে । আমার সন্দেহ দানা বাঁধছে তখন , একটা সামান্য চা ওয়ালা তো এভাবে কথা বলার কথা নয় । তখনই খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা লোকটা এক গাল হেসে উত্তর দিলেন , " একটা করে লিকার চা দি " , আমি ভাবছি কেমন হবে , চা এর ব্যাপারে আমি বেশ একটু খুঁত খুঁতে, উনি সেটা বুঝতে পেরে বললেন " এক কাপ খেয়েই দেখুন না , আপনি আপনার দার্জিলিং চা এর ফ্লেভারটা পাবেন ",। আমি অবাক হয়ে ভাবছি উনি কি করে বুঝলেন , তারপর দার্জিলিং চা নিয়ে গল্প শুরু করলেন , হ্যান্ড রোলড , সান ড্রায়েড ,, অরেঞ্জ পিকো, অটাম ফ্লাশ ,, কসবার ফুটপাথের একজন সাধারণ চা ওয়ালা , যে দোকানে দোকানে মালিক কর্মচারীদের চা খাইয়ে রোজগার করে তার এত জ্ঞান কি করে !! জটায়ুর ভাষায় মনে মনে বললাম " আপনাকে কালটিভেট করতে হচ্ছে মশাই ,,"। নানা কথায় আলাপ জমল । আমার বাসস্থানের কথা শুনে উনি দেখলাম খুব উৎসাহিত হয়ে পড়লেন । বললেন উনি নাকি কোটায় কাজ করার সময় জয়পুর এ অনেক বার এসেছেন । এই কথোপকথন এর সময় লক্ষ্য করলাম ওনার চোখ গুলো বেশ চকচক করছে , এমনটাই হয় যখন কেউ তার ভাল অভিজ্ঞতা এর কথা মনে করে কিছু বলে। আমার তো কৌতুহল তখন চরমে । নিজেকে আর চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞাসা করেই বসলাম, " ওখানে কিসের কাজ করতেন " , উত্তরে বললেন " ওই রেলের কাজ " । ভারতীয় রেলে নানা রকমের কাজ হয় , আমি জানি । ভাবলাম হয়ত আমি কোন ঠিকাদারের সাথে কাজ করতেন , কি এমন হবে আর । আমার অবাক হবার পালা তখনো শেষ হয়নি , উনি বলে চলেছেন " কাজ গুলো বেশ জটিল ছিল, জানেন ,, " , " আসলে alcatel এর সিগন্যালিং সিস্টেম ইনস্টল করতাম তো , খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার গুলো " উনি স্মৃতির সমুদ্র মন্থন করে চলেছেন ,বলেলেন "দাদা আপনি তো টেকনিক্যাল মানুষ , নিশ্চয় জানেন alcatel এর সিস্টেম কত advanced , এখনো ওদের টেকনোলজি কে কেউ টেক্কা দিতে পারেনি" রেল এর রুট রিলে , সিগনাল ইন্টারলকিং ওদের বেস্ট,, কলকাতা মেট্রোতেও তো ওদের সিস্টেম লাগিয়েছি । "
হাতে চা এর কাপ শেষ হয়েগেছে কখন , তবুও ফাঁকা কাগজের কাপ হাতে ধরে , হতভম্ব আমি সেটাও ফেলে দিতে ভুলে গেছি । মাথায় একটাই আমার তখন একটাই প্রশ্ন ,, কি এমন হল যে ওনাকে ওই কাজ ছেড়ে দিয়ে এসে ফুটপাথে চা বিলি করে জীবন চালাতে হয়।
সমর্পণ আমায় জিজ্ঞাসা করল " কি এত ভাবছ বলতো ? " ওর কথায় হুঁশ ফিরল , এরই মধ্যে উনি সমর্পণ এর থেকে চা এর দাম নিয়ে চলে গেছেন। আমি বুঝতে পারলাম, আমার একটা মস্ত ভুল হয়ে গেছে , ওনার নামটাই আমি জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছি। এমন একটা মানুষ অনামি হয়ে রয়ে গেল ,,
- অভ্ৰ
২৭শে নভেম্বর ২০২১
ফ্লাইট 6E 114
কলকাতা এলে চেষ্টা করি একবার সমর্পণ এর সাথে দেখা করতে । ও আমার বন্ধু আর ছোট ভাই। আর সাথে সাথে ও খুব ভালো গিটারিস্ট,, ওর সাথে দেখা করি ওর গিটার এর শো রুম এ,, নানা রকমের গিটার নাড়াচাড়া করা, গপ্পো করা , সাথে একটু jam করা ,, এই লোভটা সামলাতে পারি না । তাই এবার ও সারাদিন এর কাজ মেটার পর পৌঁছে গেলাম সমর্পণ এর গিটার এর দ্বিতীয় দোকানে । মহা আনন্দের rendezvous । আড্ডা গল্প , গিটার , পিয়ানো এসব নিয়ে বেশ কাটলো খানিক সময় ।
,, এমন কি আর ব্যাপার , এরকম তো হতেই পারে এই সব বলার জন্য এত ভনিতা করিনি ,গল্প এখানে শেষ নয়,,
আড্ডা গিটার এর বাইরে ফুটপাতে এসে দাঁড়ালাম , দু একটা কথা , একজন কমলা টি শার্ট পড়া মানুষ উদয় হলো,, হাতে একটা রেশন ব্যাগ , তার মধ্যে একটা বড় থার্মোস ফ্লাস্ক , কয়েকটা কৌট, কাগজের কাপ ,, ওনাকে দেখে সমর্পণ জিজ্ঞাসা করল " কি দাদা , কেমন আছেন ? সব ভালো ? ,উনি উত্তর দিলেন " সব ভাল, তোমার বৌদি ও বেশ রিকভার করেছে , আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে " । আমার খুব কৌতূহল হল , একজন অচেনা মানুষ , তাকে তো দুম করে প্রশ্ন করাও যায় না ,, উনি আমার সঙ্কোচ দূর করে বললেন ," আর বলবেন না দাদা , পুজোর সময় এবার আপনার বৌদির হঠাৎ প্যারালাইসিস হয়ে গেল একটা দিক , ডাক্তার দেখিয়ে , ট্রিটমেন্ট করিয়ে অনেকটা সামলেছে । আমার সন্দেহ দানা বাঁধছে তখন , একটা সামান্য চা ওয়ালা তো এভাবে কথা বলার কথা নয় । তখনই খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা লোকটা এক গাল হেসে উত্তর দিলেন , " একটা করে লিকার চা দি " , আমি ভাবছি কেমন হবে , চা এর ব্যাপারে আমি বেশ একটু খুঁত খুঁতে, উনি সেটা বুঝতে পেরে বললেন " এক কাপ খেয়েই দেখুন না , আপনি আপনার দার্জিলিং চা এর ফ্লেভারটা পাবেন ",। আমি অবাক হয়ে ভাবছি উনি কি করে বুঝলেন , তারপর দার্জিলিং চা নিয়ে গল্প শুরু করলেন , হ্যান্ড রোলড , সান ড্রায়েড ,, অরেঞ্জ পিকো, অটাম ফ্লাশ ,, কসবার ফুটপাথের একজন সাধারণ চা ওয়ালা , যে দোকানে দোকানে মালিক কর্মচারীদের চা খাইয়ে রোজগার করে তার এত জ্ঞান কি করে !! জটায়ুর ভাষায় মনে মনে বললাম " আপনাকে কালটিভেট করতে হচ্ছে মশাই ,,"। নানা কথায় আলাপ জমল । আমার বাসস্থানের কথা শুনে উনি দেখলাম খুব উৎসাহিত হয়ে পড়লেন । বললেন উনি নাকি কোটায় কাজ করার সময় জয়পুর এ অনেক বার এসেছেন । এই কথোপকথন এর সময় লক্ষ্য করলাম ওনার চোখ গুলো বেশ চকচক করছে , এমনটাই হয় যখন কেউ তার ভাল অভিজ্ঞতা এর কথা মনে করে কিছু বলে। আমার তো কৌতুহল তখন চরমে । নিজেকে আর চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞাসা করেই বসলাম, " ওখানে কিসের কাজ করতেন " , উত্তরে বললেন " ওই রেলের কাজ " । ভারতীয় রেলে নানা রকমের কাজ হয় , আমি জানি । ভাবলাম হয়ত আমি কোন ঠিকাদারের সাথে কাজ করতেন , কি এমন হবে আর । আমার অবাক হবার পালা তখনো শেষ হয়নি , উনি বলে চলেছেন " কাজ গুলো বেশ জটিল ছিল, জানেন ,, " , " আসলে alcatel এর সিগন্যালিং সিস্টেম ইনস্টল করতাম তো , খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার গুলো " উনি স্মৃতির সমুদ্র মন্থন করে চলেছেন ,বলেলেন "দাদা আপনি তো টেকনিক্যাল মানুষ , নিশ্চয় জানেন alcatel এর সিস্টেম কত advanced , এখনো ওদের টেকনোলজি কে কেউ টেক্কা দিতে পারেনি" রেল এর রুট রিলে , সিগনাল ইন্টারলকিং ওদের বেস্ট,, কলকাতা মেট্রোতেও তো ওদের সিস্টেম লাগিয়েছি । "
হাতে চা এর কাপ শেষ হয়েগেছে কখন , তবুও ফাঁকা কাগজের কাপ হাতে ধরে , হতভম্ব আমি সেটাও ফেলে দিতে ভুলে গেছি । মাথায় একটাই আমার তখন একটাই প্রশ্ন ,, কি এমন হল যে ওনাকে ওই কাজ ছেড়ে দিয়ে এসে ফুটপাথে চা বিলি করে জীবন চালাতে হয়।
সমর্পণ আমায় জিজ্ঞাসা করল " কি এত ভাবছ বলতো ? " ওর কথায় হুঁশ ফিরল , এরই মধ্যে উনি সমর্পণ এর থেকে চা এর দাম নিয়ে চলে গেছেন। আমি বুঝতে পারলাম, আমার একটা মস্ত ভুল হয়ে গেছে , ওনার নামটাই আমি জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছি। এমন একটা মানুষ অনামি হয়ে রয়ে গেল ,,
- অভ্ৰ
২৭শে নভেম্বর ২০২১
ফ্লাইট 6E 114