অনেকদিন হলো লেখা হয়ে ওঠেনা, আর লিখলে তো পোস্ট করি একটা দুটো। কিন্তু আজকাল একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি, তার বেশ কয়েকটা কারণ আছে।প্রথমত: আমি লেখক বা কলমপেশ লোক নই, আমার শব্দভাণ্ডার ও খুব সীমিত। তার কারণ আমার পড়াশুনার দৌড় খুব কম। বলতে পার আমি জীবনের বেশির সময় ( জেগে থাকার সময়টুকুর মধ্যে) পেটের ভাত জোটানোর জন্য চলে গেছে । অবশ্য এটা একটা অজুহাত বলা যায়। দ্বিতীয় কারণ উৎসাহ পাই না আজকাল , আর তার সাথে সৃষ্টির গোড়ায় বেশী বেশী করে জল ঢেলে দেবার জন্য বালতি , নল নিয়ে তৈরী হয়ে রয়েছে কিছু মানুষতো রয়েছেই। সে আমার লেখালিখি করার চেষ্টা হোক বা ছবি তোলার কাজ হোক , কিম্বা বাজানো হোক। আমি তো অনেককিছু পারি না , অল্প দু একটা জিনিস পারি একটু আধটু, সেটাও হারাতে বসেছে এদের ভালবাসার গুঁতোয়। তাও আজ সে সব গুঁতো, বাউন্সার, লাঠির বারি, কাটিয়ে আমার ছোটবেলার কথা নিয়ে লেখা শুরু করলাম আবার।
এটা সেই সময়ের কথা যখন ছোট্ট মাথায় সব কিছুই আবিষ্কারের মত লাগে। মাটিতে কেঁচো কেমন করে মাটির গুলি পাকিয়ে ছোট ছোট ঢিপি বানায়, কিম্বা ছাই রঙের নরম মাটির ভাঁড় আগুনে পুড়ে লাল হয়ে যায়। রাজমিস্ত্রি ইদ্রিস কি করে একবারে লাল ইট ঠিক আধাআধি কেটে ফেলে। সবই তখন অবাক করা ব্যাপার। আমি বাড়িতে সবার ছোট ছিলাম , অনেকটাই। মা , বৌদি এর কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর দুপুরবেলা টা ছিল আমার বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে নতুন নতুন জিনিস খুঁজে বার করা। তখন আমি মর্নিং স্কুলে পড়ি, ক্লাস ওয়ান বা টু। এমনই একটা দুপুরে বাবা অফিসে , দাদারা কলেজে অফিসে, বৌদি আমার সদ্য জন্মানো ভাইঝি কে নিয়ে ব্যস্ত, মা কাজকম্ম সেরে বিশ্রাম নিচ্ছে। আর আমার মধ্যে তখন ইন্ডিয়ানা জোন্স ভর করেছে। ছাদের সিঁড়ি, শোবার ঘরের খাটের তলা , কিম্বা দেয়াল আলমারির নিচের তাকে রাখা সব অদ্ভুত জিনিস নিয়ে কৌতূহল মেটানোর সময়। এই রকম এক দুপুরে আবিষ্কার করলাম একটা ছোট্ট সবুজ বাক্স , লোহার বাক্স, ছোট একটা ট্রাঙ্ক এর মত। বেশ ভারী, কিন্তু কৌতূহল মেটাতে হবে তো। কি আছে সেই লৌহ পেটিকার পেটের ভেতর, সেটা না জানলে চলবে কি করে । কোন আওয়াজ যাতে না হয় তাই আলনা থেকে মায়ের এক শাড়ি মোটা করে মেঝেতে পেতে তার উপর কোনমতে বাক্স টা নামানো হল। ততক্ষণে উত্তেজনা চূড়ান্ত, বাক্সটা খুলে দেখি তার মধ্যে আর এক অন্য জগৎ (বড়বেলায় এই রকম ঘটনা অনেক সিনেমায় দেখেছিলাম, ওই সময় তো হরি পোদ্দার ছিল না)। সেই বাক্সে মধ্যে অনেক ছোট ছোট খুপরি , এক একটা খুপরি তে এক এক রকমের খাজনা। কোনোটাতে কয়েক টা পুরোন তামার পয়সা, কোনটাতে বোতাম , অথবা ছোট্ট কাঁচি, কিছু ঝিনুক , নানা রকমের জিনিস । কিন্তু একটা জিনিস দেখে কিছুতেই বুঝতে পারছি না সেটা কি একটা কালচে খিয়েরী রঙের গোল মত শক্ত ব্যাপার ,, আর সেটার এক দিকে ফুটো অন্য দিকটা ফুটো। কাউকে জিজ্ঞাসা করা যাবে না , তাহলে ধরা পড়ে যাব। বুঝলাম এই বাক্স রহস্য উদঘাটন করতে অনেক এপিসোড লাগবে। সেবারের গ্রীষ্মের ছুটির দুপুর গুলো কাজে লেগে গেল। ওই বাক্সের সব গোপন ব্যাপার গুলো আবিষ্কারের নেশার সেবারের গরমের ছুটিটা বেশ অন্য রকম ভাবে কাতিয়েছিলাম।
কাট টু : কিছুদিন পরের কথা । মা এর খুড়তুতো ভাই, আমাদের অজিতমামা খুব সৌখিন মানুশ, পাড়ায় কোন অনুষ্ঠান থাকলে সেখানে খুব ধোপ দুরস্ত সেজে যেত , সাদা চুনট করা ধুতি , গিলে করা পাঞ্জাবি। এখন কথাটা হল গিলে করা পাঞ্জাবি ব্যাপারটা কি !!। দেখতাম এই রকম কোন অনুষ্ঠান থাকলে অজিত মামা মাড় দেয়া পাঞ্জাবি নিয়ে হাজির হয়ে যেত , আর মা সেই পাঞ্জাবি মাদুরের উপর রেখে , সেই কালচে খয়েরি ফল দিয়ে ঘষে ঘষে পাঞ্জাবির হাতা দুটো মিহি করে কুঁচকে দিত, ওটাই নাকি গিলে করা । এই ব্যাপারটা দেখে বুঝলাম ওই ফলের কি প্রয়োজনীয়তা।
আসলে ওই সবুজ বাক্সে আর অনেক রহস্য লুকিয়েছিল , সেগুলো আস্তে আস্তে উদ্ঘাটন করেছিলাম পরের দিকে।
( ছবিটা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর সাহায্য নিয়ে বানানো )
