Monday, June 10, 2024

চার জন ,, ৫৮ বছর পর

কলকাতায় আসলেই সময় লাফালাফি করে অতীতে নিয়ে চলে যায়। বিশেষ করে কলকাতা এসে যখন একবার টুক করে চুঁচড়াতে ঘুরে আসি, তখন সবসময়ই একটা অদ্ভুত নস্টালজিয়া কাজ করে। স্মৃতিচারণ এর স্পীড বোটে চেপে কখনো খেলার মাঠ, কখনো স্কুল , অথবা কোনো বিশেষ মানুষজন , ঘটনা মনের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রতিবার এর মত এবার ও চুঁচুড়া গিয়েছিলাম। অসম্ভব গরম ,সকালে গাড়ি থেকে বেরিয়েই খুব জোর ধাক্কা খেলাম , মনে হল যেন একটা furnace এ ঢুকলাম। চুঁচুড়া গঙ্গার ধারের শহর , এমনটা গরম আগে মানে ছোটবেলা থেকে কোনোদিনই দেখিনি। কিন্তু সে যতই ঘেমে নেয়ে একসা হই না কেন নস্টালজিয়ার কামড় থেকে তো মুক্তি নেই। তাই চুঁচুড়া যাবার আগেই প্ল্যান করেছিলাম যে এবার অনেক পুরোনো ক্লাসমেট দের সাথে দেখা করব। ছোটবেলার বন্ধু সবারই খুব কাছের হয়। কিন্তু এরা কথাটা হল এর কত ছোট বেলার বন্ধু। অবাক হয়ে পড়লে চলবে না। আজ থেকে ৫৮ বছর , হ্যাঁ ঠিক মত হিসাব করেই লিখেছি , ১৯৬৬ সালে আমরা এই কজন একসাথে জীবনের প্রথম বার এর মত স্কুল এ গিয়েছিলাম। ক্লাস এ ছিলাম প্রায় ২০ জন। সবার সাথে যোগাযোগ নেই । যাদের সাথে কথা হয় তাদের খবর দিলাম  , আমি আসছি , ওরাও নেচে গেল। ঠিক হল রবিবার বিকালে বসবে আড্ডার আসর। পৌঁছে গেলাম ব্যানার্জি কেবিন এর দোতলায়। বলা ছিল আগেই । টেবিল এ বসতেই ইন্দ্র এসে পড়ল । একটু পরেই হাজির হল রিঙ্কু, খানিক বাদে এল মিতু। মুহুর্তের মধ্যে আমরা চারজনই ভুলে গেলাম যে আমরা সবাই তিন কুড়ি পার করে ফেলেছি। বাকি টেবিল গুলোতে যারা বসেছিল তারা প্রথমে অবাক হলেও আমাদের হুল্লোড়ে নির্ঘাৎ ভাবছিল এই চারটে বুড়ো বুড়ি চায় কি ? তাতে আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। আমরা আমাদের মত হৈ হৈ করে স্মৃতিচারণ শুরু করে দিলাম। সবথেকে মজার ব্যাপার যেটা হল, সবার দেখলাম সেই প্রথম স্কুলের অনেক কথা ভালোভাবে মনে আছে। একটু পরেই শুরু হল স্কুলের ক্লাসমেট দের মত লেগপুলিং। এই স্মৃতিচারণের প্রতিটা মুহূর্ত এতই প্রাঞ্জল ছিল যে আমরা ঐ দিনগুলোকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম যেন। সাথে সাথে এসে গেল গরম গরম ফিশ ফ্রাই , কফি আর ক্যারামেল কাস্টার্ড পুডিং। খেতে খেতে আড্ডা জমে উঠল। দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। ঘড়ির মোড় এর দোকান গুলোয় আলো জ্বলল। আমরা এতই মশগুল ছিলাম বুঝতেই পারিনি কখন আড়াই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। চারজন মিলে  আমরা আরো একবার চারুবাবুর কিন্ডারগার্টেন স্কুলে আরো একবার ঘুরে এলাম। কয়েকটা ছবি তোলার পর অনেকখানি এনার্জী নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলাম। ৫৮ বছর পর reunion , এই ভালো লাগা তো অনবদ্য, ,শেয়ার না করে পারলাম না।

Saturday, June 8, 2024

টিনের চালের কাফে, দুটো মানুষ , আর এক রাশ ভাল লাগার গপ্প

ভালো ছবি দেখার , ভালো গান শোনার নেশা সেই কিশোর কাল থেকেই। ভালো গল্প, পরিচালক সুন্দর করে বলতে পারলে ছবি সবসময় একটা অন্য মাত্রা পায়। আর তখন দর্শক হিসাবে হাঁ করে ফ্রেম বাই ফ্রেম গলাধঃকরণ করে ফেলি। 
এই গল্পটার সূত্রপাত এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে, জয়পুরে আমোদিনী আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। জয়পুরে এই রকম ছবির মহোৎসব খুব একটা হয় না। সমস্ত কাজ কম্ম ফেলে হৈ হৈ করে উৎসব যাপনে সামিল হয়ে গেলাম। বেশ কয়েকটা ভালো ছবি দেখার সুযোগ হয়ে গেলো। সবকটা নিজের নিজের মত করে শ্রেষ্ঠ। তারই মধ্যে একটা ভাল পাওয়া হলো "দোআঁশ" । এক রাশ নতুন মুখ , নতুন বিষয় , নতুন ভাবনা, এক দল আন্তরিক কলাকুশলী আর একজন অত্যন্ত দক্ষ নিবেদিত প্রাণ পরিচালক যে শুধু মাত্র ভালো কাজ করায় বিশ্বাস করে, এরা সবাই মিলে একটা অসম্ভব ভাল লাগা দিল সেদিন।
না, গল্পটা এখানে শেষ নয়। "দোআঁশ" দেখে ভালো লাগার সাথে সাথে আরো একটা লাভ হলো যে একটা অত্যন্ত সৃজনশীল আর ভালো একটা মানুষ এর সাথে পরিচয় হওয়া। কী করে যেন হঠাৎই দোআঁশ এর পরিচালক সায়ন বন্ধু হয়ে গেল। শুধু বন্ধু হল তাই না , দেখলাম আমাদের ভাবনা চিন্তার সেট এর ভেন ডায়াগ্রাম আঁকলে দেখা যাবে intersection এর area টা প্রায় পুরোটাই। ব্যাস আর যায় কোথা, শুরু হল বক বক। সে কলকাতা ফিরে এল, আমি রয়ে গেলাম জয়পুরে, কিন্তু কথা বার্তা জারি রইল। এই যোগাযোগের সূত্র ধরে আলাপ হল একটা খুব গুণী , ঝলমলে, ফুটফুটে একটা ছানা । সে আবার পাগড়ি বাঁধে, নোলক পড়ে আর হুড়মুড় অনেক কথা একসাথে বলে ফেলে। সে সায়ন এর দলে এক সাথে কাজ করে। ছবির চরিত্রদের জামাকাপড় পড়ায়, মাঝে মাঝে ক্যামেরার সামনেও দাঁড়িয়ে পড়ে। কলকাতায় এসে এহেন মানুষজনের সাথে একটু আড্ডা দেব না তাতো হবার না। সবাই ব্যস্ত মানুষ , তাই আগে থেকে ঠিক করে রাখা হল যে আমরা জমিয়ে আড্ডা মারব একদিন। পাঁজি দেখে, তারা নক্ষত্রের হিসাব করে ঠিক হল ৬ই জুন বিকালে আড্ডা ওভার কফি হবে । সায়ন বলে দিল চলে এসো ম্যাক্স স্টার কাফে তে । গপ্পো হবে। লোকেশন ও পেয়ে গেলাম। কিন্তু বরুণ বাবু, ইন্দ্র বাবু আর পবন বাবু , তারা তিনজনে মিলে মনে করলেন যে একটু মস্করা করি। বিশ্ববাংলা গেট পেরোতেই তুমুল বৃষ্টি , বাজ পড়ছে , তার সাথে হাওয়ার তান্ডব। এগোতে এগোতে শহর শেষ , বাঁশ বাগান শুরু হয়ে গেল, আমার সারথী বেশ ঘাবড়ে গিয়ে বলল "স্যার আপনি এ কোথায় নিয়ে এলেন ,এখানে তো কিছুই নেই। দেখলাম পাশে একটা টিনের চালা , গুগল বাবা বলছে ওটাই নাকি ম্যাক্স স্টার কাফে। আমিও একটু বেশ ঘাবেড়ে গিয়ে সায়নকে ফোন করলাম । সে বলল "ওটাই , ঢুকে পারো, আমরা আসছি । " কিন্ত গাড়ি থেকে নামার উপায় নেই । বৃষ্টির তান্ডব বেড়ে চলেছে । যদিও সাথে দু দুটো ভালো ক্যামেরা ছিল, তাও মোবাইলেই কিছু ছবি ভিডিও তুলে রাখলাম। জায়গাটা বেশ ভালো ,শহরের বাইরে , বেশ একটু গা ছমছম পরিবেশ । খানিক বাদে ওরা এলো , কফি সহযোগে আড্ডা , গপ্পো । বৃষ্টি থেমে গিয়ে , আকাশ পরিষ্কার হল। কথা বলতে বলতে কখন অন্ধকার হয়ে গেছে খেয়াল করিনি। শেয়াল এর ডাক শুনে ঘড়ি দেখতে বুঝলাম সময়টা সন্ধ্যা পার করে রাতের দিকে যাচ্ছে। তল্পি তল্পা নিয়ে , কাদা পেরিয়ে উঠলাম গাড়িতে । 
এত কথা কেন বলালাম , এটা তো একটা খুবই সাধারণ ঘটনা , আসল কারনটা হল বেশি কিছু ভাললাগা একসাথে পেলাম ওই ঘন্টা তিনেক সময়ে, অনেকদিন পর এমন বৃষ্টি উপভোগ করলাম বৃষ্টির মাঝে বসে, চারপাশের ঘন বাঁশ ঝাড় গুলো বৃষ্টির মাঝে হাওয়ার তালে তালে দুলছিল  , সে এক দারুন অভিজ্ঞতা। আর তার সাথে জুড়ে গেল সায়ন আর অঙ্কিতার সাথে গপ্পো করার আনন্দ। তাই ভাবলাম ভাল লাগাটা শেয়ার করি, তাই এত বকর বকর।