Sunday, August 20, 2023

স্মৃতিচারণ ৮ - ছবি তোলার গপ্পো

গতকাল আলোকচিত্র বিষয় নিয়ে উদ্দীপনার দিন ছিল। আসলে আমরা যারা একটু আধটু ছবি তোলার চেষ্টা করি তাদের মনে করে সবাই মিলে তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে একটা দিন উৎসর্গ করেছে । এটা খুবই আনন্দের কথা । আমার ছবি তোলার নেশা শুরু হয়েছিল ৫০ বছর আগের এক শীতকালের সন্ধ্যায় , যেদিন আমার বড়দাদা , মানে আমাদের সবার দাদাভাই একটা ক্লিক থ্রি ক্যামেরা হাতে দিয়ে বলেছিল " শুরু করে দে", সেই থেকে শেখা শুরু , আজও সেই অধ্যবসায় চালু রয়েছে। অল্প কিছু কিছু শিখতে পেরেছি হয়তো , অনেকখানি শেখা বাকি রয়ে গেল। খুব মনে পড়ে শুরু করে ছিলাম শীতকালের চন্দ্রমল্লিকা ফুলের ছবি দিয়ে । ORWO NP 22 , Panchromatic 120 film, মোট ১২ টা ছবি তোলা যেত । কিপটের মত ছবি তুলতাম । একটু বড় হলাম হাতে পেলাম একটা SLR, Ashahi Pentax এর spotmatic, সুপার তাকুমার লেন্স , একটা ৫০মিমি , আর একটা ২০০মিমি টেলি,, ব্যাস শুরু হয়ে গেলো আমার serious photographic journey দাদাভাই এর তত্ত্বাবধান এ। তখন ক্লাস টেন ,দাদাভাই একটা Mamiya 645 কিনল। আমার কি সৌভাগ্য , হাতে দিয়ে বলল " দ্যাখ তো ক্যামেরাটা কেমন !" সত্যি বলতে যারা একবার ওই ধরেনের ক্যামেরা তে ছবি তুলেছে তারাই জানে medium format SLR camera তে ছবি তোলার কি অনুভূতি । বাড়িতে নানা রকমের ক্যামেরা ছিল , কি করে জানি না Nikon এর সাথে আমার প্রেম হয়ে গেল , Nikormat, Nikon Photonic , এই সব ক্যামেরায় ছবি তুলতে তুলতে বড় হয়ে গেলাম । মাঝে বহু বছর চাকরির কারনে ঘরছাড়া হয়ে ছিলাম । যথারীতি ছবি তোলা হতো না । এর ওর কাছে ক্যামেরা চেয়ে ছবি তুলতাম , কখনো practika, কখনো olympus,, কখনো yashika ,কিন্তু সেই আনন্দ পেতাম না। মাঝে canon EOS কিনেছিলাম। সে ও আমার Nikon প্রেম বুঝে একদিন ব্যাগ সমেত হারিয়ে গেল। অবশেষে ২০১১ সালে একটা Nikon D90 , কিনে ফেললাম , তাও কিস্তিতে । পুরনো প্রেম ফিরে পেলাম । নতুন করে শুরু হলো পথ চলা । ধীরে ধীরে বুঝতে আমার মানুষ এর ছবি আর Abstract নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগছে । ল্যান্ডস্কেপ ও তুলি , কিন্তু ভালোলাগাটা ওই দিকেই। একটু আধটু পড়াশুনা , এর ওর কাজ দেখে শুরু করলাম । 
এখন বুড়ো হয়েছি , রিটায়ার করেছি , তাই আবার ফিরে এসেছি পুরনো প্রেম এর কাছে । সম্বল সেই D90 , আর গোটা তিনেক লেন্স, কিছু আলো ,, আর বেশ কিছু শুভানুধ্যায়ীদের ভালবাসা । একটু আধটু কাজ করছি , ভালোবাসা , সে যেমনই হোক না কেন সে তো ভালবাসা ই। কিছু মানুষজন আছেন যারা মনে করেন আমার এ সব নিয়ে কাজ করার কোন যোগ্যতাই নেই। তারা রীতিমত তাদের বিরূপ মতামত জানান। এটা খুবই সত্যি শেখার তো অনেক বাকি , তাও কাজকম্ম যদি না করি তাহলে জানব কি করে যে আমার খামতি কোথায়। নিজের ভালোলাগা আর নেশার তাড়নায় ক্যামেরা বাগিয়ে , স্টুডিও এর আলো সাজিয়ে মডেল দের ক্যামেরা বন্দী করি । খান কয়েক সাম্প্রতিক কাজ পোস্ট করলাম । দেখো কেমন ! পেশা না হলেও নেশা তো বটেই ,, তাই এই ভাবনা নিয়েই জীবনটা কাটিয়ে দেব , নাই বা পারলাম ভালো ছবি তুলতে , পুরস্কার পেতে , ছবি তোলার নেশায় বুঁদ হয়েই না হয় থেকে গেলাম আজীবন।

Saturday, August 12, 2023

স্মৃতিচারণ ৭ - নিমপীঠ এর কথা

সাল টা ১৯৮৬-৮৭। তখন আমি সদ্য পাস করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার , কাজ করি কুম্ভাণী কনসালট্যান্ট এ। পিনাকীদার আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ,আর দত্তদার মেন্টরিং একটা shell structure ডিজাইন করে ফেলেছিলাম , বারোটা two hinged concrete arch আর salvadori shell এর সমন্নয়ে একটা গোল মত অডিটোরিয়াম । কিন্তু সেটা তো বানাতে হবে , যে ঠিকাদার কাজ করছিল সে ফাউন্ডেশন আর প্লিন্ত্থ বিম বানিয়ে চম্পট দিয়েছে । কুম্ভাণী সাহেব এর মাথায় হাত। দু একদিন বাদে দেখলাম দুজন গেরুয়া পরিহিত সন্ন্যাসী এসেছেন , ওনার সাথে অনেক আলোচনা হল। তারপর একদিন কুম্ভানী সাহেব ডেকে বললেন নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রম এ যেতে হবে , ওদের অডিটোরিয়াম বানানোর লোক নেই। এর আগে ওই রকম জায়গায় থাকিনি তার উপর ওটা সুন্দরবন এলাকা । আজ থেকে ৩৫ বছর আগের কথা ,,আশ্রম এর স্কুল আর কয়েকটা রিসার্চ সেন্টার ছাড়া কিছুই ছিলনা । আমার আর সুব্রতর ঠাঁই হল আশ্রমের গেস্ট হাউসে। দোতলার ঘর , রাতে মশারী টাঙানো must, না হলেই পোকামাকড় আক্রমন করতে পারে। প্রথম রাতের পরের দিন ঘুম ভাঙলো ভোরের প্রার্থনা সঙ্গীতের শব্দে। অদ্ভুত পরিবেশ । এক মহারাজ একটু পরে এসে বলে গেলেন আশ্রমের ভেতরেই আমাদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা। শুরু হয়ে গেলে মহারাজদের আপ্যায়ন। ওনারা সন্ন্যাসী মানুষ , শ্রদ্ধেয় , কিন্তু কি অপরিসীম ভালবাসায় আমাদের যত্ন নিতেন , ভালো লেগে গেল জায়গাটা। খুব মন দিয়ে কাজ কম্ম শুরু করে দিলাম। তাছাড়া উপায় ও ছিলনা। কাজ না করলে সময় কাটানো খুব কঠিন হয়ে যেত আমার পক্ষে , যদিও গিটার টা সাথে ছিল , তাও। সে যাই হোক লোকাল মিস্ত্রি জসীমউদ্দীন তার দলবল নিয়ে কাজে লেগে পড়ল। ওদের জন্য structure এর geometry টা বেশ কঠিন ছিল , two hinged parabolic arch, salvadori shell এ সব ব্যাপার ওই সুন্দরবনের মিস্ত্রি জীবনে শোনে নি। Construction site এর ঠিক পাশেই একটা খালি মাঠ ছিল সেই মাঠ সমান করে নিয়ে shuttering এর টেমপ্লেট, staging এর পাইপ এর মাপ করে কাটাকাটি ইত্যাদি শুরু হল । দেখতে দেখতে প্রথম কাস্টিং এর দিন ও এসে গেল ,, সে কি অসম্ভব উত্তেজনা । যেন এক বিশাল মহাযজ্ঞ। কাস্টিং শুরু হলে থামা যাবে না , আর সবটাই ম্যানুয়াল কাজ । স্বামীজী, মহারাজরা মাঝে মাঝে এসে আশীর্বাদ উৎসাহ এক সাথে দিয়ে যেতেন। মাসে একটা করে সেগমেন্ট কাস্ট করা হত একি shuttering form আর staging ব্যবহার করে । এক বছরের অধ্যাবসায় আর সবার উৎসাহে কাজ শেষ হল। তৈরী হল নিমপীঠ রামকৃষ্ণ আশ্রমের ইন্দিরা গান্ধী অডিটোরিয়াম।

এই গল্পটা শোনানোর জন্য কিন্তু এই সব কথা বলছি না । আমার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এর সহপাঠীদের অনেকে এর থেকে অনেক অনেক বড় কাজ করেছে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। আমি আসলে একটা নস্টালজিয়ার কথা বলার জন্য এই সব ভূমিকা করলাম । এবছর জুন মাসের ৭ তারিখ গিয়েছিলাম নিমপীঠ, রাস্তা উন্নত হয়েছে ভীড় বেড়েছে ,কিন্তু ওখানে পৌঁছে দেখলাম সব কিছু কেমন যেন এক রকম রয়ে গেছে । নতুন বিল্ডিং হয়েছে আশ্রমের আসে পাশে, লোক জন বদলে গেছে । বদলায়নি শুধু অনুভূতি , বদলায়নি ওনাদের স্নেহ ভালবাসা। মেরামতি চলছিল , তাও নিজের হাতে গড়া ওই কাজ একবার হাতে ছুঁয়ে এলাম। মহারাজ , কর্মচারীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যেন আমাদের আদর যত্নে কোনো ত্রুটি না হয়। অনেক সকাল সকাল পৌঁছে গিয়েছিলাম । তাই গেস্ট হাউসের একটা ঘর তাড়া হুরো করে খুলে দিলেন ওখানকার অফিসের ভদ্রলোক । বললেন " বিশ্রাম করুন , আমি জলখাবার এর ব্যবস্থা করি " । শুরু হল আপ্যায়ন । Breakfast করে চারিদিকে একটু চরতে বেরোলাম । খুব গরম ছিল সেদিন । তাই খানিক বাদেই আবার ac ঘরে ফিরে এলাম । শুয়ে শুয়ে জানলা দিয়ে বাইরে গাছ পালা দেখছিলাম ,, আর ওই দিন গুলোর কথা খুব মনে পড়ছিল । এরপর ডাক পড়ল লাঞ্চ করার । আশ্রমের মধ্যে না , ওনারা ব্যবস্থা করেছেন রিসার্চ সেন্টার এর হলে। গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড । বসার জায়গা সাদা পর্দা দিয়ে ঘেরা , মাঝে ডাইনিং টেবিল, টেবিল ক্লথ বিছানো । খুব লজ্জায় পড়ে গেলাম । এলাহি ব্যবস্থা , বিয়ে বাড়ীর ভোজ এর মত। মহারাজ নিজে দাড়িয়ে থেকে খাওয়ালেন । খাওয়া দাওয়ার পর অনেক গল্প হল সবার সাথে । এরপর বাড়ি ফেরার পালা । ৩৫ বছর আগের সেই স্নেহ , সেই ভালবাসা , সেই একই অনুভূতির আবেশ নিয়ে কলকাতার দিকে পাড়ি জমালাম।।

- অভ্রাজিত