কদিন এর জন্য বাড়ী, মানে আমাদের পারিবারিক বাড়ি , আমার বড়ো হয়ে ওঠার জায়গা, চুঁচুড়ায় গিয়েছিলাম । দশ দিন মত ছুটি । Covid এর কৃপায় প্রায় আড়াই বছর ঘরে ফেরা হয়নি । তাই উদ্দীপনা একটু বেশীই ছিল। তাই ঠিক করেছিলাম এবার কটা দিন যাবো শিকড়ের খোঁজে, খানিকটা হলেও যদি ছেলেবেলার সময়টাকে একটু ছুঁয়ে আসার আশায়। খানিক পেলাম ,অনেকটা খুঁজে পেলাম না ।
আমার ছোটবেলার অনেকটা জুড়ে রয়েছে আমাদের মাঠ , এই রকম মাঠ কলকাতার গড়ের মাঠ ছাড়া কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। যারা চুঁচুড়ায় আমার contemporary তাদের কাছে এই মাঠ স্বর্গের চেয়ে কিছু কম ছিল না । তারা অস্বীকার করতে পারবে না। গঙ্গার (হুগলী নদী) পাড় থেকে শুরু করে তিন তিনটে ফুটবল মাঠ পেরিয়ে তার পর বাড়ী ঘর শুরু। আমাদের বাড়ীর থেকে গোলাবাগান পেরিয়ে মাধবীতলার গলির পরেই আসত উন্মুক্ত মাঠ, আমরা বলতাম ফার্স্ট মাঠ , এই মাঠের দুটো ফুল স্কেল ক্রিকেট গ্রাউন্ড ছিল , প্রথম টা ছিল ওয়েস্টার্ন গ্রাউন্ড , মাঠের পূর্ব দিকের কোনায় মহসিন কলেজের কানাইলাল হোস্টেল, আর বাঁ দিকে মলয় দের (দাস বাড়ি) , সামনে Woodburn Club , Bengal club এর সবুজ টিন এর টেন্ট, আর পাশে Town Club er লাল বাড়ি। ফার্স্ট মাঠের কোনায় কিছু মহিলা বেশ কিছু লোভনীয় জিনিসের ঝাঁকি নিয়ে বসত, চিনে বাদাম , গুড়ের ক্যান্ডি, ঝাল ছোলা,,আরো কত কি , শীতকালে এর সাথে থাকত পাকা পাকা লাল লাল টোপা কুল এর সম্ভার । ৫ পয়সা পকেটে থাকলেই হল , মনে বেশ একটা রাজা রাজা ভাব দু তিন জন মিলে ভাগ করে সে সব স্বর্গীয় snacks খাওয়া যেত। সেখান থেকে টাউন ক্লাব এর পাস দিয়ে প্রথম ক্রিকেট মাঠ পাড় করলে আসত Northern Ground,, এর পশ্চিম দিকে ডাচ ভিলা , নামে ডাচ ভিলা কিন্তু ওটা ছিল মণ্ডল পরিবারের বাড়ি । আর মণ্ডল বাড়ির গা ঘেঁষে ছিল বক্সিং ক্লাব । আমাদের ওখানে বাড়িগুলো সবাই চিনত পরিবারের নামে , আমাদের সবাই দে বাড়ি বলত , সে রকম ছিল বড় শীলের বাড়ি, বিদু সেন বাড়ি , মুখুজ্জে বাড়ি । ফার্স্ট মাঠের পর ছিল সেকেন্ড মাঠ, সেটাও একটা গোটা ফুটবল গ্রাউন্ড , মাঠের উত্তর প্রান্তে ছিল লাল দীঘি আর আর লালদীঘির ওধারে ছিল অজস্র খিলান ওয়ালা চুঁচুড়া কোর্ট, এই বিল্ডিংটা প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা ছিল । আর সেকেন্ড মাঠের দক্ষিণ দিকে ছিল কাদের সব কোয়ার্টার ,আর অগ্রদুতী ক্লাব । সেগুলো অবশ্য লোপাট হয়ে এখন রবীন্দ্র ভবন হয়েছে। এরপর সেকেন্ড মাঠ পেরোলেই থার্ড মাঠ , যার পোষাকী নাম commissioner's ground , কারন তার পাশেই বর্ধমান ডিভিশনের কমিশনারের বিশাল বাংলো, আর এই মাঠের অন্য প্রান্তে ছিল আমাদের স্কাউট ডেন , পাশেই একটা টেনিস কোর্ট , সেখানে সব হোমরা চোমরা লোকজন খেলত ,, আমরা দুর থেকে দেখতাম আর নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতাম , আসলে ওনাদের খেলার দৌড় সেইরকমই ছিল ,প্রসঙ্গত মনে পড়ল ওই কোর্টের একটা বল বয় ছিল ,, সে সবার থেকে ভালো টেনিস খেলতে পারতো । আমাদের লোভ ছিল টেনিস বল গুলোর ওপর , রোঁয়া উঠে গেলেই বাতিল হয়ে যেত , আর আমরা এক টাকা দিয়ে কিনে নিতাম , সেগুলো দিয়ে আমাদের পুরো শীতকাল ক্রিকেট খেলা হয়ে যেত।
সে যাই হোক , এবার আসল গপ্পে ফিরি , যে কারণে মাঠ নিয়ে এত ভূমিকা । সেদিন চুঁচুড়ার বাড়িতে পৌঁছেই কোনোমতে কিছু খেয়ে টো টো করতে বেড়িয়ে পড়লাম । মাঠের টান, সে কি উপেক্ষা করা যায়। দিনটা ছিল রবিবার , দেখি জুন মাসের গরম উপেক্ষা করেও অনেক লোক জন মাঠের ধাপি গুলোয় বসে আড্ডা মারছে । কিন্তু অবাক হলাম মাঠের হাল দেখে , সব মাঠ গুলো দেখলাম লোহার বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে , বেশ একটু মনখারাপ হয়ে গেল, Northern Ground, এর ঢালুতে বসে ক্রিকেট ম্যাচ দেখার ব্যাপারটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আরো মনখারাপ হয়ে গেল পুরোনো ডাচ ভিলা মানে মণ্ডল দের বাড়ির হাল দেখে , এক কোনায় ঝন্টিদা দের অংশটুকু পড়ে আছে বাকি সব ভেঙে বিশাল বিশাল বহুতল বাড়ী,, মনে হল কারা যেন সব দায়িত্ব নিয়ে আমাদের ছোটবেলাটা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। ছোট বেলায় মাঠের ওদিকটায় একটু কাদা জমে থাকত , আর ছোট ছোট কচু পাতার ঝোপ ছিল । আমরা ফড়িং ধরে ওদের কচু পাতা ডাঁটা ভেঙে রস খাওয়াতাম , কে জানে কি হত , ফড়িং গুলোর নেশা হয়ে যেত ,উড়তে পারত না ,, অনেকক্ষণ বসে থেকে তারপর পালাতো ওটাই ছিল আমাদের খেলা। ভাবলাম যাই মাঠের ওই দিকটায় , যদি ফেলে আসা ছেলে বেলার দু একটুকরো খুঁজে পাই , কিন্তু সেই ঘাসের তলায় কাদা, কচু পাতার ঝোপ , আর ফড়িং গুলোর দেখা পেলাম না , হারিয়ে গেছে আধুনিকতার ভারে ।
ইতি
অভ্রজিত