তখন খুবই ছোট ছিলাম , আমাদের বাইরের ঘরের দেয়াল এ বিশাল ছবি ছিল , একজন দাড়িওয়ালা জোব্বা পরা মানুষ । আমার বাবার কালেকশন, অবাক হয়ে দেখতাম , জানতাম না উনি কে । দেখতাম আজকের এই দিনটায় ওনার ছবিতে মালা পরিয়ে , ধুপ জ্বালিয়ে সবাই প্রণাম করত, আমিও করতাম ,, ভাবতাম হয়তো কোন দেবতা , একটু বড় হয়ে ওনার নাম জানলাম ,উনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । তখন ইস্কুলে যেতে শুরু করেছি , রোজ আরতি মিস কণিকা মিস অর্গান বাজিয়ে গান শোনাতেন ,, রবিঠাকুরের গান ,, গান গুলোর সাথে সাথে ছবি তৈরি হয়ে গিয়েছিল ,, আর নিজের অজান্তে ওই তিন বছরের আমি রবি বুড়োর সাথে জড়িয়ে গেলাম ,, উনি ঢুকে পড়লেন আমার সত্বায় । বুঝতে শুরু করলাম উনি কোন দেবতার চেয়ে কোন কোন অংশে কম নন ,, উনি রবি ঠাকুর ,,।
বাড়িতে ভীষণ ভাবে রবীন্দ্র চর্চা হত। আমার বড় দাদা গান করত , রবীন্দ্রনাথ সঙ্গীত , মাস্টারমশাই আসতেন, সবাই ওনাকে মাস্টারমশাই বলতেন , আমিও বলতাম ,, তখন আমার আর কত বয়স , ৪ বা ৫ হবে , গানের ক্লাস হত দাদাভাই , বৌদি, মুরারী দা , সরলা কাকিমা সবাই গান শিখত ,, আর আমি মাস্টারমশাই এর পাশে বসে থাকতাম । উনি অসাধারণ এক গুণী মানুষ ছিলেন , রবি ঠাকুরের সান্নিধ্য পাওয়া এক মানুষ , সমরেশ চৌধুরী । আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বীজ উনি বপন করেছিলেন । একদিন হঠাৎ করে উনি চিরকালের জন্য চলে গেলেন ,, আমি ছাদে গিয়ে লুকিয়ে খুব কেঁদেছিলাম সেদিন ।
তারপর কয়েকটা বছর কেটে গেল , দেখলাম দাদাভাই তখন গান শেখায় ,, আমিও কৈশোর এ প্রবেশ করেছি ,, আমি গলায় গান কোনোদিন গাইতে পারতাম না , কিন্তু শুনে শুনে কান তৈরী হয়ে উঠল আস্তে আস্তে , মনের মধ্যে সব সময় গান চলত । খুব ইচ্ছা হত নিজের গলায় একটু গান শুনি। দাদাভাই এর কাছে অনেক মেয়ে গান শিখতে আসত দূর দূর থেকে ,, তাই আমি লজ্জায় দাদাভাই কে বলতে পারতাম না । বাড়িতে একটা টেপ রেকর্ডার ছিল , মনে আছে stellaphone এর , লুকিয়ে টেপ রেকর্ডার এ রেকর্ড করে শুনতাম ,, ও চাঁদ তোমায় দোলা দেবে কে,, । গান গাওয়া হল না , হয়তো গলাও ছিল না ,, কিন্তু গান রয়ে গেল আমার ভেতরে ।
দাদাভাই অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায় এর কাছে গান শেখা শুরু করল , ওনার রেকর্ড করা নানা গানের মধ্যে "আজ তোমারে দেখতে এলেম ,," খুব বিখ্যাত ছিল ,, আমার ছোট ছোট ভাইঝিরা ওনার নাম দিয়ে দিল আজ তোমারে জেঠু ,, বাড়ির বাকিরাও ওই নামেই ওনাকে রেফার করত । একবার উনি এলেন আমাদের বাড়িতে , কথায় কথায় আমাকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি গান করি কিনা ? খুব লজ্জা পেয়ে না বলেছিলাম , "তাহলে কিছু বাজাও কি " ,,আমার মাথায় দুস্টুমি , হয়তো ডিফেন্স মেকানিজম ,, আমি বলেছিলাম " হ্যাঁ ,, আমি গ্রামোফোন বাজাই " ,, উনি খুব হেসেছিলেন আর আমি বাড়িতে মার খেতে খেতে বেঁচে ছিলাম । তার বছর দুই বাদে যেদিন আমার মাধ্যমিক এর রেজাল্ট বের হল , আমি আর দাদাভাই নৈহাটী যে ওনার অনুষ্ঠানে গিয়েছি , জানতামই না মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বেরিয়ে গেছে ,, উনি তড়িঘড়ি করে ওনার তবলিয়া জহরদা কে পাঠালেন আমার ফল জেনে আসার জন্য ,, এমন সব মানুষের সান্নিধ্য পেয়ে এসেছি ,, যোগসূত্র একটাই রবীন্দ্রসঙ্গীত ,,
অভ্র
মে 2020